আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের আইনি ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও আলোচিত অধ্যায়। ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুরের মানিক পশারী সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ ও হত্যার অভিযোগ এনে মামলা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনালের মূল মামলার ৮ নম্বর অভিযোগের প্রধান সাক্ষী ও বাদী হিসেবে যুক্ত হয়।
এই দীর্ঘ ১৫ বছর পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শনিবার (২৪ অক্টোবর) টুঙ্গিপাড়ায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় মৃত্যু হয় মানিক পশারীর। আর এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই পিরোজপুরে তৈরি হয় এক নাটকীয় পরিস্থিতি।
পারিবারিক সদস্যদের তথ্য
সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া নিয়ে শুরু থেকেই নানা গুঞ্জন থাকলেও, খোদ তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিস্ফোরক তথ্যে উন্মোচিত হয় চাঞ্চল্যকর সত্য। ছোট ভাই চান মিয়া পশারী জানান, সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য নানা প্রলোভন ও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার চুক্তি বা বিনিময়েই মানিক পশারী অর্জন করেছিলেন তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট।
আর মানিক পশারীর বোন হেনা আক্তার আল্লামা সাঈদীকে আল্লাহর অলি উল্লেখ করে ভাইয়ের এমন ভূমিকার জন্য তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন।
নিজেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা দাবি করলেও মানিক পশারী প্রকৃতপক্ষে কোনো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, এমনকি তিনি নিজেও এক জবানবন্দীতে এই সত্য স্বীকার করে গেছেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি
অন্যদিকে, যুদ্ধকালীন ইনস্ট্রাক্টর বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল সালাম বাতেন ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মির্জা জহুরুল হক স্পষ্ট জানিয়েছেন, সাঈদী রাজাকার ছিলেন না; বরং সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার পরই তৎকালীন সরকারের প্রতিনিধিরা মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে গেজেটভুক্ত করেছিলেন।
প্রজন্ম দলের আহ্বায়ক গাজী কামরুজ্জামান শুভ্রও একই দাবি করেন।
দাফনের পরিস্থিতি
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকায় তাঁর বিতর্কিত অবস্থানের কারণে মানিক পশারীর মৃত্যুর পর স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টির জন্যই শেষ পর্যন্ত কোনো চেনা মুখ বা স্বতঃস্ফূর্ত জানাজা ছাড়াই, রাতের আঁধারে মোবাইলের আলো জ্বেলে নিজ হাতে কবর খুঁড়ে দাফন সম্পন্ন করেন তাঁর মেয়ে ও দুই বোন।
যদিও পরবর্তীতে আলোচনা ওঠে যে, কথিত এই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার জানাজা ও দাফনে সাধারণ মানুষ বাধা দিয়েছিল।
অতীতের দাফনে বাধার ইতিহাস
অন্যদিকে, ভুয়া এই মামলার মাধ্যমে যাঁদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার, তাঁদের শেষ বিদায়ের সময় কেমন নজিরবিহীন বাধা ও পৈশাচিকতার শিকার হতে হয়েছিল। সে সময় কেন কেউ কোন প্রশ্ন করেনি বা প্রতিবাদ করেনি সেই বিষয়েও এখন আলোচনা উঠেছে।
স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সময়ে কথিত যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর চট্টগ্রামে অবস্থিত পৈতৃক বাড়ি গুডস হিলে হামলা চালায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ। এছাড়াও, সেখানে তাঁর কবরে হামলা, ভাঙচুর ও নামফলক অপসারণ করা হয় ন্যাক্কারজনকভাবে।
হাসিনার আমলে একই অপরাধের দায়ে ২০১৪ সালের অক্টোবরে কারাগারে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমীর গোলাম আযমের মৃত্যুর পর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে তাঁর জানাজা পড়ার ঘোষণা ঘিরে তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ওই সময় গণজাগরণ মঞ্চ ও মুক্তিযুদ্ধমঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠনের হামলার মুখে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় এবং জুতা প্রদর্শনের মতো চরম মাস্তানির মধ্য দিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে জানাজা সম্পন্ন হয়।
যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর, ২০১৫ সালের এপ্রিলে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের লাশ শেরপুরের বাজিতখিলা ইউনিয়নে নিজ এতিমখানা প্রাঙ্গণে নেয়া হলে ভোররাতে জমায়েত হওয়া অনুসারী ও স্থানীয়দের মাইকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয় হাসিনার পালিত পুলিশ।
একইভাবে, ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের মৃতদেহ ফরিদপুরের পশ্চিম খাবাসপুরে নেয়া হলে স্থানীয় গোষ্ঠী ও নামধারী কিছু মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে উন্মুক্ত মাঠে জানাজার সুযোগ দেয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত কড়া প্রহরায় আইডিয়াল ক্যাডেট মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে তড়িঘড়ি দাফন করা হয়।
২০১৬ সালের মে ও সেপ্টেম্বরে মতিউর রহমান নিজামী এবং মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের পর তাঁদের পৈতৃক ভিটায় দাফনের সময়ও তীব্র বাধা, রাস্তা সীলগালা এবং সাংবাদিকদের দূরে রেখে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাতের আঁধারে গোপনে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছিল।
ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের সেই দমনপীড়ন, রাষ্ট্রীয় ও দলীয় বাধার মুখে দাফন সম্পন্ন করার ইতিহাস এবং বর্তমানের এই সামাজিক বয়কট ও জনরোষ, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিচার ও রাজনীতির মাঠের এই অধ্যায়গুলো এক ভিন্ন বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়। যেখানে অতীতের রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ রূপ নিয়েছে গণরোষ ও সামাজিক বয়কটে।
আরও পড়ুন:







