২০০৬ সালের অক্টোবর মাস। ক্যালেন্ডারের পাতায় তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদের শেষ দিনগুলো।
এদিকে, সংবিধানের বিধান অনুযায়ী পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল। এই সময়ে কে হবেন প্রধান উপদেষ্টা, তা নিয়েই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় চরম সংঘাত।
নিয়ম অনুযায়ী সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট তাঁকে বিএনপি ঘেঁষা অভিযোগ করে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের পরিবর্তে রাজপথকে বেছে নেয় রাজনৈতিক দলগুলো। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরাসরি আহ্বানে ঢাকাসহ সারা দেশের রাজপথে লগি ও বৈঠা হাতে নিয়ে নেমে আসে হাজার হাজার দলীয় কর্মী।
পল্টনে রক্তাক্ত সংঘাত
শনিবার (২৮ অক্টোবর) সকাল থেকেই বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট, পল্টন মোড় এবং বিজয়নগর এলাকায় ১৪ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা মুখোমুখি অবস্থান নেয়। দুপুর গড়াতেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
দুপক্ষের মধ্যে শুরু হয় ভয়াবহ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং রামদা ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। মুহূর্তের মধ্যে পুরো পল্টন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনেই চলে রাম-ত্রাসের রাজত্ব।
সেদিনের সংঘাতে বায়তুল মোকাররম মসজিদের পাশেই নির্মমভাবে শহীদ হন ঢাকা কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী গোলাম কিবরিয়া শিপন।
শুধু শিপনই নন, সেদিন কেবল ঢাকায় নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাতের জেরে প্রাণ হারান সর্বমোট ১৩ জন মানুষ। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর নিথর দেহের ওপর লগি-বৈঠা দিয়ে পেটাতে থাকা এবং লাশের ওপর উঠে উল্লাস করার মতো নারকীয় ও পৈশাচিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে গোটা দেশ। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে সেই ছবি ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় তীব্র নিন্দা ও সমালোচনার ঝড়।
অর্থনীতিতে বিপর্যয়
শনিবার (২৮ অক্টোবর) শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক সহিংসতা কেবল প্রাণহানিই ঘটায়নি, বরং দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। টানা তিন দিনের এই অশান্তি, হরতালে দেশজুড়ে ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
সরকারি ও বেসরকারি হিসেবে এই তিনদিনের রাজনৈতিক সংঘাতে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। অচল হয়ে পড়ে দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা।
সেদিনের ঘটনার ভয়াবহতা স্মরণ করতে গিয়ে শিউরে ওঠেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও প্রত্যক্ষদর্শীরা।
শনিবার (২৮ অক্টোবর) আওয়ামী লীগ লগি-বৈঠা নিয়ে সারাদেশে যে তাণ্ডব চালিয়েছিল, তার প্রত্যক্ষদর্শী বিএনপি নেতা ও ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। সেইদিনের নারকীয় তাণ্ডবের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, তৎকালীন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের মূল উদ্দেশ্যই ছিল সন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া।
স্বৈরাচারী শাসন, গুম ও খুনের মতো অপরাজনীতির কারণেই শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে মন্তব্য করে বিএনপি নেতা এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, জনগণের চরম প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়ায় ভবিষ্যতে রাজনীতিতে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর আর কোনো সুযোগ নেই দলটির।
মামলা প্রত্যাহার ও বিচারহীনতা
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে পল্টন থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের ৪৬ জন শীর্ষ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।
কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবলে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিবেচনায় প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এর ফলে আসামিরা খালাস পান এবং বিচার পাওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। জন্ম নেয় চরম বিচারহীনতার সংস্কৃতির।
এদিকে, জামায়াতের মহানগরী মজলিসে শূরা সদস্য মিকাঈল ইসলামের মতে, এই স্বৈরাচার ও খুনিদের বিচার না হলে আবারো এর পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে তাদের কঠোর বিচার দাবি করেন।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে লগি-বৈঠা হামলা, হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞসহ সকল অপরাধের নতুন করে মামলা চালু করে বিচার হওয়া উচিত বলে মনে করেন এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
ইতিহাস যেন নিজেই নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। ২০০৬ সালের শনিবার (২৮ অক্টোবর)-এর ঠিক ১৭ বছর পর, ২০২৩ সালের শনিবার (২৮ অক্টোবর)-এও বিএনপি ও বিরোধীদের সমাবেশে একই কায়দায় হামলা এবং পুলিশি ক্র্যাকডাউনের ঘটনা ঘটে। আগের মতো এই ঘটনাটিও রয়ে গেছে বিচারের বাইরে।
রাজনীতিতে সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে শনিবার (২৮ অক্টোবর)-এর মতো রক্তক্ষয়ী অধ্যায় বারবার ফিরে আসবে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করেছে এবং বর্বরতার কালো দাগ এঁকে দিয়েছে। আর বিচারহীনতার এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে সকলেই।
আরও পড়ুন:







