সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও খুনিদের শনাক্ত করা যায়নি। জানা যায়নি হত্যার উদ্দেশ্যও। থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও র্যাবের পর টাস্কফোর্সের হাতে তদন্তের দায়িত্ব গেলেও রহস্যের সমাধান হয়নি। দীর্ঘ তদন্তের পরও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে ২৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করে টাস্কফোর্স। তদন্ত শেষ করতে আরও এক বছর সময় চাওয়া হলেও আদালত ছয় মাস সময় দিয়েছেন। বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ আগামী ২৯ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন। ওই দিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহাকে আদালতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।
তদন্তে নতুন করে আলোচনায় জিয়াউল আহসানের নাম
গত আগস্টে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা এক বক্তব্যে দাবি করেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। জিয়াউল আহসানের এক সহকারীকে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কী তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে, তা জানতে চিফ প্রসিকিউটরকে চিঠি দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, তাদের তদন্ত শেষ হলে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত টাস্কফোর্সের তদন্তকারীদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
মঙ্গলবার হাইকোর্টে দাখিল করা অগ্রগতি প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পড়ে শোনান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। বাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী শিশির মনির।
পরে সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিয়ে সরকারের গোপন করার কিছু নেই। কাউকে রক্ষা করারও কোনো কাজ নেই। ২০১২ সালে ক্ষমতায় থাকা সরকার সম্পর্কে অনেক কিছু শোনা যেত। তাই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক, সেটিই সবাই চান।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলার তদন্তে যুক্ত ছিলেন, এমন অনেককে এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, এতে তদন্তের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে।
পারিবারিক কলহের প্রমাণ নেই, হত্যায় তাড়াহুড়ো করেনি খুনিরা
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি খুন হননি। তাঁদের একজনকে হত্যার পর অন্যজন আত্মহত্যা করেছেন, এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দুজনকেই হত্যা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ঘটনাস্থলের অবস্থা এবং নিহতদের শরীরে আঘাতের ধরন পর্যালোচনা করে টাস্কফোর্সের পর্যবেক্ষণ, হত্যাকাণ্ড সংঘটনের সময় খুনিরা তাড়াহুড়ো করেনি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডে লুণ্ঠিত মোবাইল ফোন ও দুটি ল্যাপটপ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন প্রধান ও গণমাধ্যমের মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম এবং র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাওয়া যায়নি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি।
একজন সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কিংবা তদন্তের দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ময়নাতদন্তে আঘাতের ধরন নিয়ে বিশেষ পর্যবেক্ষণ
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের তথ্য অনুযায়ী, সাগর ও রুনির শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে উল্লেখযোগ্য আঘাতের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। টাস্কফোর্সের পর্যবেক্ষণে, এ ধরনের আঘাতের ধরন পেশাদার খুনিদের অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দুজনের শরীরে একাধিক ক্ষত ছিল, যেগুলোর কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে। মৃত্যুর আগে তাঁরা অনেকক্ষণ ক্ষতসহ জীবিত ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। তাঁদের ঘাড়, পিঠ ও চোখের নিচে আঘাতের চিহ্ন ছিল।
চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব মেলেনি
টাস্কফোর্স জানিয়েছে, পূর্ববর্তী তদন্তকারী কর্মকর্তারা এ মামলায় ১৬৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়েছিলেন। বর্তমান তদন্তে ৯০ জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে ২৪ জনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
পূর্ববর্তী তদন্তে সন্দেহভাজন আটজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছিল। মামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মোট ৪৭টি বিভিন্ন ধরনের আলামত জব্দ করা হয়।
সাগর ও রুনির লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছিল। তবে নিহতদের ভিসেরা সংরক্ষণ না করায় পরবর্তী সময়ে আদালতের অনুমতি নিয়ে কবর থেকে লাশ তুলে পুনরায় ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়। চেতনানাশক পদার্থের উপস্থিতি যাচাই করতে তাঁদের ফুসফুস, যকৃৎ ও পাকস্থলীর নমুনাও পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়।
প্রাপ্ত ভিসেরা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে টাস্কফোর্স।
ডিএনএ পরীক্ষায় অজ্ঞাত দুই পুরুষের পরিচয় মেলেনি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি, বঁটি, ছুরির বাট, সাগর ও রুনির পরিধেয় পোশাকসহ বিভিন্ন আলামত থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া ২৫ জনের বুকাল সোয়াব বা মুখের ভেতরের কোষ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসের পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়।
পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলামতে পাওয়া ডিএনএর সঙ্গে নমুনা দেওয়া ব্যক্তিদের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থলে চারজনের ডিএনএ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী। তিন পুরুষের একজন সাগর সারওয়ার এবং নারীটি মেহেরুন রুনি বলে শনাক্ত হয়েছেন। বাকি দুই পুরুষের পরিচয় এখনো উদ্ঘাটন করা যায়নি।
এ ছাড়া আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসা থেকে উদ্ধার করা প্রায় ৩০০টি সিডিতে বিভিন্ন ধরনের তথ্য, কথোপকথন, ভিডিও, অডিও ও অপরাধসংক্রান্ত উপাত্ত থাকতে পারে। এর মধ্যে ৯০টি সিডির মূল্যায়ন করা হয়েছে। বাকি ২১০টি সিডি পর্যালোচনার কাজ এখনো শেষ হয়নি।
তিন সংস্থার হাত ঘুরে তদন্তের দায়িত্ব টাস্কফোর্সে
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি। পরদিন ভোরে তাঁদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই দিনই রুনির ভাই নওশের আলী রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
শেরেবাংলা নগর থানা চার দিন তদন্ত করার পর মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিবি ৬৩ দিন তদন্ত করে। পরে একটি রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব।
২০১২ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত টানা ১২ বছর ৬ মাস ১৬ দিন মামলাটির তদন্ত করে র্যাব। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় টাস্কফোর্সকে।
টাস্কফোর্সের আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন পিবিআই প্রধান। এর সদস্য হিসেবে রয়েছেন অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), র্যাব ও পুলিশ সদরদপ্তরের একজন করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চললেও সাংবাদিক দম্পতি হত্যার উদ্দেশ্য এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
আরও পড়ুন:







