আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে এক দীর্ঘ অধ্যায়।
বুধবার (১২ আগস্ট) ২০০৯ সালে পিরোজপুর থানায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও হত্যার মতো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে একটি মামলা করেছিলেন পিরোজপুরের মানিক পশারী। পরবর্তী সময়ে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে চলা মূল মামলার সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং ৮ নম্বর অভিযোগের প্রধান বাদী ও সাক্ষী ছিলেন এই মানিক পশারীই।
মৃত্যুর পর পরিবারের বিস্ফোরক তথ্য
এদিকে, ২০০৯ সালের সেই আলোচিত মামলার দীর্ঘ ১৫ বছর পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর টুঙ্গিপাড়ায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে মৃত্যু হয় পশারীর। তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরে তৈরি হয় এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় পরিস্থিতি।
সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া এবং তৎকালীন নানা ঘটনা নিয়ে শুরু থেকেই নানা গুঞ্জন ছিল। খোদ মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যরাই এ নিয়ে তাদের অবস্থান ও বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেছেন।
মানিকের ছোট ভাই চান মিয়া পশারী এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য বিভিন্ন প্রলোভন ও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।
চান মিয়া পশারী শুধু মিথ্যা সাক্ষ্যের প্রলোভনের কথাই ফাঁস করেননি, বরং মানিক পশারী কীভাবে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছিলেন এবং তিনি নিজে কেন বাদ পড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে, তার এক চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি দিয়েছেন। চান মিয়ার ভাষ্যমতে, সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার চুক্তি বা বিনিময়েই মানিক পশারী তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট বা সনদ অর্জন করেছিলেন।
বোনের বক্তব্য সাঈদী আল্লাহর অলি
ভাইয়ের এই বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মানিক পশারীর বোন হেনা আক্তার, আল্লামা সাঈদীকে আল্লাহর অলি হিসেবে উল্লেখ করেন। এছাড়া, তাঁর ভাই কীভাবে সাঈদীর বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দিলেন, তা তিনি জানেন না বলেও মন্তব্য করেন হেনা।
সেইসঙ্গে, নিজেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা দাবি করা মানিক পশারী প্রকৃতপক্ষেই কোনো মুক্তিযোদ্ধা নন, এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য ও স্বীকারোক্তি সামনে এসেছে। যেখানে তিনি নিজেই নিজের এক জবানবন্দীতে এই সত্য প্রকাশ করেছেন।
মূলত বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি কিংবা লোভের বশবর্তী হয়েই তিনি আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার চুক্তি করেছিলেন বলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় উঠে এসেছে। আর এই মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানের বিনিময়েই তাকে তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট বা সনদ প্রদান করা হয় বলে তথ্য রয়েছে।
আর এমন তথ্য সামনে আসার পর থেকেই ফুঁসে ওঠে স্থানীয় জনতা।
মরদেহ পৌঁছানোর পর তীব্র জনরোষ
এদিকে, শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে মানিক পশারীর মরদেহ পিরোজপুরে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু হয় তীব্র জনরোষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৎকালীন সময়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও সাক্ষ্য দেয়া হয়েছিল।
তবে, এরপরেও তীব্র জনরোষ এবং সামাজিক বয়কটের মুখে পড়ে তাঁর পরিবার। শেষ পর্যন্ত কোনো চেনা মুখ বা স্বতঃস্ফূর্ত জানাজা ছাড়াই, রাতের নিস্তব্ধ আঁধারে কেবল মোবাইলের ক্ষীণ আলো জ্বেলে নিজ হাতে কবর খুঁড়ে, পশারীর দাফন সম্পন্ন করেন তাঁর মেয়ে ও দুই বোন।
একটি মিথ্যা মামলা, মিথ্যা সাক্ষ্যের বিনিময়ে পাওয়া ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ আর লোভ-প্রলোভনের রাজনীতির পরিণতির মধ্য দিয়ে পিরোজপুরের মাটিতে মানিক পশারীর এই বিদায় ইতিহাসের পাতায় এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
আরও পড়ুন:







