সোমবার

২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১১ কার্তিক, ১৪৩৩

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা, সংস্কার নিয়ে বাড়ছে বিরোধ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:০০

শেয়ার

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা, সংস্কার নিয়ে বাড়ছে বিরোধ
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, তা এখন বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধের মুখে পড়েছে। জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর এবং গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় আসার পরও সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি, সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈধতা ও সংসদের ক্ষমতার পরিধি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মতপার্থক্য কাটেনি। এতে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ছে।

ক্ষমতাসীন বিএনপি বলছে, জনগণের কাছে দেওয়া নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে। তবে দলটির অবস্থান, সাংবিধানিক পরিবর্তন করতে হবে বিদ্যমান সংসদীয় ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী পক্ষের একটি অংশের দাবি, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় অনুযায়ী সংস্কার কার্যকর করতে হবে। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর পুরো প্রক্রিয়া ছেড়ে দিলে সনদের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছে তারা।

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে বিএনপি সরকার। তাঁর দাবি, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনীহা দেখাচ্ছে, গণভোটের রায় উপেক্ষা করছে এবং সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে কেবল সংশোধনের পথে এগোতে চাইছে। এসব অভিযোগ তুলে তিনি সংসদের ভেতরে ও রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

সংস্কার বাস্তবায়নে বিএনপির অঙ্গীকার

বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেছেন, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা দলের দায়িত্ব। বিএনপির ৩১ দফায় প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন এবং ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার মতো বিষয় রয়েছে বলে জানান তিনি।

রিপন বলেন, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী আশা করছেন, আগামী শীতকালীন অধিবেশনে বেশ কিছু বড় ধরনের সংবিধান সংশোধনী আনা সম্ভব হবে। এসব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংবিধানের মৌলিক চরিত্রের সঙ্গে প্রস্তাবগুলোর সমন্বয় কীভাবে করা হবে, তা নিয়েও বিএনপি ভাবছে।

তিনি বলেন, ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাষ্ট্রপতি শুধু নিম্নকক্ষের ৩০০ সদস্যের ভোটে নির্বাচিত হবেন, নাকি নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের মোট ৪০০ সদস্যের ভোটে নির্বাচিত হবেন, সেটি বিবেচনার বিষয়। এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য সংবিধানে নতুন বিধান যুক্ত করতে হবে।

ডিসেম্বরের মধ্যে সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ করা গেলে জানুয়ারিতে তা কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন রিপন। তিনি বলেন, জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করলে মানুষ বিএনপির কাছে জবাব চাইবে।

গণভোটের রায় নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি

জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর সরকার রাজনৈতিকভাবে মীমাংসিত বিষয়গুলো অবজ্ঞা করার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, সংবিধান সংস্কার হতে হবে গণভোটের রায় অনুযায়ী।

নাহিদ বলেন, ২০২৪ সালের বিপ্লব ছিল কর্তৃত্ববাদ প্রত্যাখ্যানের ঐতিহাসিক ঘটনা। বাংলাদেশের মানুষ লোকদেখানো সংস্কার নয়, কাঠামোগত পরিবর্তন চেয়েছিল।

জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব

২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ আত্মপ্রকাশ করে। রাষ্ট্র পরিচালনা, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এতে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব প্রস্তাবের উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।

সনদের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রোধ, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। তবে সনদে স্বাক্ষর করলেও সব প্রস্তাবে সব দলের সম্মতি ছিল না। কয়েকটি বিষয়ে দলগুলো ভিন্নমত জানিয়েছিল, যা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, আসন বণ্টনের পদ্ধতি, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মতো বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন

জুলাই সনদের সাংবিধানিক প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভূমিকা ও বৈধতা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে ইতিবাচক ফল এলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু নির্বাচনের পর বিএনপির সংসদ সদস্যরা পৃথক পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। দলটির যুক্তি, বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের পরিষদের সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। বিএনপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে চায়।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর আশঙ্কা, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে গণভোটের রায় ও রাজনৈতিক সমঝোতার গুরুত্ব ক্ষুণ্ন হতে পারে। ফলে বিরোধটি শুধু একটি পরিষদের বৈধতা নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই; রাষ্ট্র সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একদিকে বিএনপি বিদ্যমান সংবিধানের ধারাবাহিকতাকে বৈধতার ভিত্তি হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক সমঝোতা ও গণভোটের রায়কে সংস্কারের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছে।

সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও জনগণের রায়ের সমন্বয়

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় আসার পর সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রত্যাশা বেড়েছিল। তবে গণভোটের ফল কীভাবে আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোয় রূপ পাবে, তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

গণভোটে সংস্কারের পক্ষে সমর্থন পাওয়া এবং প্রতিটি প্রস্তাব বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট আইনি পদ্ধতি নির্ধারণ করা আলাদা বিষয়। একইভাবে আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন তুলে গণভোটের রাজনৈতিক তাৎপর্য উপেক্ষা করলেও নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।

সংস্কার বাস্তবায়নে একদিকে সংবিধানের বিধান অনুসরণ করা, অন্যদিকে জনগণের রায় ও রাজনৈতিক দলগুলোর পূর্বসম্মত অঙ্গীকারের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রাখা প্রয়োজন। এই দুইয়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমন্বয় না হলে সংস্কার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে পারে।

সমঝোতা না হলে বাড়তে পারে রাজনৈতিক চাপ

সংস্কার নিয়ে বিরোধের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও যুক্ত হয়েছে। বিএনপির আশঙ্কা, নির্বাচিত সংসদের বাইরে পৃথক সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর উদ্বেগ, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব নিয়ন্ত্রণ করা হলে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য দুর্বল হয়ে পড়বে।

এই অবিশ্বাস সংসদের বাইরেও প্রভাব ফেলতে পারে। সংস্কার নিয়ে সমঝোতা না হলে বিরোধী দলগুলো রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে সরকার সংস্কারকে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সীমিত রাখতে চাইলে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে যেসব বিষয়ে সব দলের ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। মতপার্থক্য থাকা প্রস্তাবগুলো নিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে আলোচনা এবং বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে বিরোধ নিরসনে নিরপেক্ষ আইনজ্ঞদের মতামত ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ছাড়া সনদ বাস্তবায়নের সময়সীমা, অগ্রগতি এবং প্রতিটি প্রস্তাবের আইনি পথ সম্পর্কে জনগণকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক অবিশ্বাস কাটিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে জুলাই সনদ রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক দলিল হয়েই থেকে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সনদের মাধ্যমে প্রত্যাশিত বাস্তব পরিবর্তন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।