সোমবার

২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১১ কার্তিক, ১৪৩৩

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে বিএনপির সামনে বিকল্প পদ্ধতির চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:০০

শেয়ার

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে বিএনপির সামনে বিকল্প পদ্ধতির চ্যালেঞ্জ
ছবি সংগৃহীত

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে চায় ক্ষমতাসীন বিএনপি। তবে এই সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগকে যুক্ত করার বিষয়ে দলটির আপত্তি রয়েছে। এ অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগ ও সরকার গঠনের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটি। সংসদের উচ্চকক্ষ, স্পিকার এবং সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতির ভিত্তিতে সরকার গঠনের একাধিক প্রস্তাব আলোচনায় এলেও কোনোটি চূড়ান্ত হয়নি।

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে। তবে সরকারপ্রধান নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের কয়েকটি প্রস্তাবে দলটির আপত্তি রয়েছে। অতীতের নির্বাচনকালীন সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ ও সংকটের অভিজ্ঞতার মধ্যে নতুন ব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে একাধিক প্রস্তাব

সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া, কর্মপরিধি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, গঠনপ্রক্রিয়া ও কর্মপরিধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাবও উঠে আসে।

আলোচনায় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেটিকে কেন্দ্র করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যবস্থা রাখা যায় কি না, তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। উচ্চকক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ সৃষ্টি করে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে।

বিকল্প হিসেবে সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে নির্বাচিত স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি স্পিকার ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিদের দুই পক্ষের সম্মতিতে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের বিধান রাখা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, প্রস্তাবগুলোর কোনোটিই চূড়ান্ত হয়নি। সব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে সবার লিখিত মতামতও চাওয়া হয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত

জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি প্যানেল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধী দলের ডেপুটি স্পিকার এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধিকে রাখার কথা বলা হয়েছে।

প্যানেল ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী ধাপে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের যুক্ত করে বিকল্প পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের প্রস্তাবও রয়েছে।

তবে রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগকে সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত জানিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ও উপদেষ্টাদের নিয়োগে দলটি ঠিক কোন বিকল্প পদ্ধতি অনুসরণ করতে চায়, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান জানিয়েছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করে তাঁর দল। তাঁর মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এই ব্যবস্থা বাতিল করায় দেশের নির্বাচনি পদ্ধতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় আবারও তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে নির্বাচনের বিষয়ে সরকার আন্তরিক।

সেলিমা রহমান জানান, সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই এ প্রক্রিয়ায় এগোতে চায়। তবে বিএনপি কোন পদ্ধতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়, সে বিষয়ে এখনই চূড়ান্তভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজনে অংশীজনদের সঙ্গে আরও আলোচনা হতে পারে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিএনপির অতীত অভিজ্ঞতা

নির্বাচনকালীন সরকার গঠন ও প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের অভিজ্ঞতা বিএনপির সামনে বারবার এসেছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দলটি সরকার গঠন করে। এরশাদ সরকারের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করে। রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে গঠিত ওই সরকারের সময় সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ও আন্দোলন জোরালো হয়। আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানায়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ওই নির্বাচনের পর ১৯ মার্চ খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ২৬ মার্চ সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস হয়। ৩০ মার্চ খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন। এরপর বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। ওই সরকারের অধীনে ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট জয়ী হয়। বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১০ অক্টোবর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়।

পাঁচ বছর পর ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংকট আরও গভীর হয়।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। পরদিন ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। ওই সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৭ সালের ঘটনাপ্রবাহে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন, প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের উদ্যোগে অতীতের এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প কাঠামো নির্ধারণের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।

২০১৩ সালে খালেদা জিয়ার প্রস্তাব

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়ে বিএনপির একটি নির্দিষ্ট বিকল্প প্রস্তাব সামনে এসেছিল ২০১৩ সালে। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে ১০ জনকে নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারপক্ষ পাঁচজন এবং বিরোধী দল পাঁচজনকে মনোনীত করবে। দুই পক্ষের সম্মতিতে তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা করা হবে।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেওয়া ওই প্রস্তাব ছিল রাজনৈতিক সমঝোতার একটি উদ্যোগ। এটি বিএনপির বর্তমান প্রস্তাব নয়। তবে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনে দলটির অতীতের বিকল্প চিন্তার একটি নজির।

নতুন কাঠামো নির্ধারণে যেসব প্রশ্ন সামনে

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হলে বিকল্প পদ্ধতি কী হবে, উপদেষ্টাদের কীভাবে নিয়োগ দেওয়া হবে, সরকারের মেয়াদ কত দিন থাকবে এবং নির্বাচন আয়োজনের বাইরে সরকারের ক্ষমতা কতটুকু থাকবে, এসব বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

বিশেষ কমিটির আলোচনায় উচ্চকক্ষ, স্পিকার এবং সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতির ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের যেসব প্রস্তাব এসেছে, সেগুলো এখনও বিবেচনাধীন। অন্যদিকে, সরকারপ্রধান নিয়োগের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগকে যুক্ত করার বিষয়ে বিএনপির আপত্তি রয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালে বিএনপি নীতিগতভাবে সমর্থন জানালেও সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে দলটির চূড়ান্ত অবস্থান এখনও প্রকাশিত হয়নি। বিশেষ কমিটির সুপারিশ এবং বিএনপির নির্দিষ্ট প্রস্তাব সামনে এলে নতুন ব্যবস্থার কাঠামো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।