রবিবার

২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১০ কার্তিক, ১৪৩৩

সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব ও সুযোগ নিয়ে মতপার্থক্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:৩৪

শেয়ার

সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব ও সুযোগ নিয়ে মতপার্থক্য
ছবি সংগৃহীত

সংসদে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, আইন প্রণয়ন এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে এই দায়িত্ব পালনের জন্য সংসদে কতটা সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তা নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। সরকারি দলের আহ্বান, সংসদে এসে সমস্যার সমাধানে আলোচনা করুক বিরোধী দল। অন্যদিকে বিরোধী দলের অভিযোগ, স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ না পাওয়া, বিল পর্যালোচনায় সীমিত সময় এবং প্রস্তাবের যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ কমছে।

সংবিধান ও কার্যপ্রণালিবিধিতে বিরোধী দলের সুযোগ

সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালিবিধিতে সংসদ সদস্যদের প্রশ্ন উত্থাপন, বিতর্কে অংশগ্রহণ, সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া এবং স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে আইন ও মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সুযোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নির্ভর করে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সেগুলোর প্রয়োগের ওপর।

সংবিধানের ৭৫ অনুচ্ছেদের ১(ক) দফায় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি দিয়ে নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। ১(খ) দফায় উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিধান রয়েছে। ফলে সংসদে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীতি প্রযোজ্য হলেও বিরোধী দলের অধিকার ও দায়িত্বের পরিসর নির্ধারণে কার্যপ্রণালিবিধির সংশ্লিষ্ট বিধানও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন ও নোটিশে সরকারের জবাবদিহি

সংসদের কার্যপ্রণালিবিধির ৪৩ থেকে ৪৮ বিধিতে সংসদ সদস্যদের প্রশ্ন উত্থাপন ও উত্তর দেওয়ার প্রক্রিয়া নির্ধারিত রয়েছে। এসব বিধির আওতায় বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি প্রকল্প, অর্থ ব্যয়, নিয়োগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও জনসেবাসংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে তথ্য চাইতে পারেন।

এ ছাড়া ৬৮ থেকে ৭০ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে স্বল্প সময়ের আলোচনা এবং ৭১ বিধিতে জরুরি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব প্রক্রিয়ায় দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি, সার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন বিষয় সংসদে উত্থাপন করা যায়। তবে নোটিশ গ্রহণ ও আলোচনার সুযোগ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট বিধির শর্ত এবং স্পিকারের সিদ্ধান্তের ওপর।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র ড. মো. নাজিবুর রহমান মোমেনের দাবি, বিরোধী দল প্রবাসীদের অধিকার, জ্বালানি সংকট ও সারের সংকট নিয়ে নোটিশ দিয়েছে। এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। তবে আট থেকে ১০টি নোটিশের মধ্যে দু-একটি নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানান তিনি।

নাজিবুর রহমান মোমেনের অভিযোগ, বিরোধী দল সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলেও সেগুলো গ্রহণ করা বা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে না।

স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ নিয়ে বিরোধী দলের অভিযোগ

সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলো আইন প্রণয়নের প্রস্তাব পরীক্ষা, আইন বাস্তবায়নের অবস্থা পর্যালোচনা এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকির সুযোগ দেয়। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে এসব কমিটির কার্যপরিধির উল্লেখ রয়েছে। কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে তথ্য ও প্রশ্নের উত্তরও চাইতে পারে।

তবে সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে প্রতিটি স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্য রাখা কিংবা কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে নিয়োগের বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। সংসদের কার্যপ্রণালিবিধির ২৪৬ ও ২৪৭ বিধিতে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন ও সদস্য নিয়োগের বিধান রয়েছে। ২৪৭ বিধি অনুযায়ী, কমিটির সদস্য ও সভাপতিকে সংসদ নিয়োগ করে এবং কোনো মন্ত্রী কমিটির সভাপতি হতে পারেন না। তবে সব কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার শর্তও ওই বিধিতে নেই।

নাজিবুর রহমান মোমেনের অভিযোগ, জুলাই সনদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে যেসব পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে না দেওয়ায় সরকারের কার্যক্রম তদারকিতে ভূমিকা রাখার সুযোগ সীমিত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বিল পর্যালোচনায় সময় কম দেওয়ার অভিযোগ

সংসদে বিলের বিভিন্ন ধারা নিয়ে আলোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব এবং ভোটের মাধ্যমে বিরোধী দলের সদস্যরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারেন। সংসদীয় কমিটিতেও বিল পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুপারিশ করার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পরিসর নির্ভর করে কার্যপ্রণালিবিধি, সংসদের সিদ্ধান্ত ও নির্ধারিত সময়ের ওপর।

নাজিবুর রহমান মোমেনের অভিযোগ, কোনো কোনো বিল পর্যালোচনার জন্য সংসদীয় কমিটিকে মাত্র দুই দিন সময় দেওয়া হচ্ছে। এতে বিলের বিভিন্ন দিক যাচাই এবং গঠনমূলক মতামত দেওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং জনগুরুত্বপূর্ণ ও নাগরিক অধিকারসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সংসদে কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

তবে কমিটিতে সময় কম দেওয়া বা আলোচনার সুযোগ সীমিত করার অভিযোগের বিষয়ে সরকারি দলের চিফ হুইপের বক্তব্যে নির্দিষ্ট কোনো বিল বা কমিটির সময়সীমা নিয়ে সরাসরি জবাব পাওয়া যায়নি। তিনি সংসদে এসে আলোচনা করার ওপর জোর দিয়েছেন।

সংসদে আলোচনার আহ্বান সরকারি দলের

সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, দেশে এখনো এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি, যেখানে সংসদে আলোচনা করে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তাঁর মতে, রেসকোর্স ময়দানে পাঁচ লাখ লোক জড়ো করে বক্তৃতা দিলেই মানুষ তা দেখবে এবং সেটাই শক্তি—এমন ধারণা এখনো রয়েছে। টেলিভিশন ও রেডিওতে বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষের মতামত গড়ে তোলার বিষয়টিও যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সংসদের বয়স ৫৫ বছর হলেও অনেক ক্ষেত্রে এখনো আদিম যুগের চিন্তাভাবনা থেকে বের হওয়া যায়নি।

বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংসদ কার্যকর করতে হলে বিরোধী দলকেও যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিরোধী দল সংসদে এসে আলোচনা করলে সরকার তা স্বাগত জানাবে।

বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচির সমালোচনা করে চিফ হুইপ বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান রাতারাতি করা সম্ভব নয়। পাঁচ মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর মতো কোনো জাদু সরকারের হাতে নেই।

বিরোধী দলের কাছে কার্যকর সমাধান থাকলে তা সংসদে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রস্তাব বাস্তবায়নের সুযোগ থাকলে সরকার তা বিবেচনা করবে।

ওয়াকআউটে কোরাম সংকটের সম্ভাবনা কতটা

সরকারের সঙ্গে মতবিরোধের প্রতিবাদে বিরোধী দল কখনো কখনো সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। তবে ওয়াকআউটের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদের কার্যক্রম বন্ধ হয় না। সংবিধানের ৭৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদে উপস্থিত সদস্যসংখ্যা ৬০-এর কম হওয়ার বিষয়টি সভাপতির নজরে আনা হলে তিনি অন্তত ৬০ জন সদস্য উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত বৈঠক স্থগিত রাখবেন অথবা মুলতবি করবেন।

ফলে বিরোধী দলের ওয়াকআউটের কারণে কোরাম সংকট সৃষ্টি হলে সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তবে শুধু ওয়াকআউটের কারণে সরকারের কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা পরিবর্তনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না।

নাজিবুর রহমান মোমেনের মতে, সরকারি দলের বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিরোধী দলের পক্ষে ওয়াকআউট করে কোরাম সংকট সৃষ্টি করা কঠিন। বিরোধী সদস্যরা অধিবেশন থেকে বেরিয়ে গেলেও সরকারি দলের সদস্যসংখ্যা থাকায় কোরাম সংকট তৈরির সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন তিনি।

দায়িত্ব পালনে সুযোগ ও কার্যকর অংশগ্রহণের প্রশ্ন

সংবিধান ও কার্যপ্রণালিবিধি বিরোধী দলকে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় উত্থাপন, প্রশ্ন করা, বিল পর্যালোচনা এবং সংসদীয় কমিটির কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়। তবে সুযোগ থাকা আর তা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারা এক বিষয় নয়। একইভাবে বিরোধী দল সুযোগ সীমিত হওয়ার অভিযোগ তুললেই তাদের সব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।

সরকারি দলের চিফ হুইপ সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের মুখপাত্রের অভিযোগ, সংসদে প্রস্তাব দেওয়ার পরও সেগুলো নিয়ে কার্যকর আলোচনা বা বাস্তবায়নের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।

সংসদের কার্যকারিতা মূল্যায়নে বিরোধী দলের উপস্থিতি বা ওয়াকআউটের হিসাবের পাশাপাশি তাদের নোটিশ ও প্রস্তাবের নিষ্পত্তি, বিল পর্যালোচনায় অংশগ্রহণ, স্থায়ী কমিটির কার্যক্রম এবং সরকারের জবাবদিহির বাস্তব ফল বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিরোধী দল সংসদে পাওয়া সুযোগ কতটা কাজে লাগাচ্ছে, সেটিও মূল্যায়নের বিষয়।

সংসদ কার্যকর করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের গঠনমূলক অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকা পালন—দুই দিকই গুরুত্বপূর্ণ।