রবিবার

২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১০ কার্তিক, ১৪৩৩

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড; তবে বাকী নির্যাতিতরা কেন বিচার পায় না?

নিজস্ব প্রতিবেদক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:৫০

শেয়ার

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড; তবে বাকী নির্যাতিতরা কেন বিচার পায় না?
ছবি সংগৃহীত

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মসংস্থানে নিয়োজিত আছে। তার মধ্যে তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্র সৌদি আরবে সরকারি হিসাবেই কাজ করছে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি, যাদের প্রতিটি ফোঁটা ঘামে লেখা থাকে স্বজনদের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন।

কিন্তু, সুদূর মক্কার এক মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগে শরীয়া আইনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে দুই প্রবাসীর। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, আটক, বিচারপ্রক্রিয়া, এমনকি শিরচ্ছেদের মাধ্যমে সাজা কার্যকর হয়ে যাওয়া পর্যন্ত, এই গোটা ঘটনার বিন্দুমাত্র টের পায়নি রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পরই কেবল টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের ২২ বছর বয়সী যুবক নজরুল ইসলাম এবং টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের নগরছাওয়ালী গ্রামের ফজল মিয়ার মেয়ে সুইটি আক্তার।

নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের পরিণতি

পরিবারের আকুলতা ও দারিদ্র্যের করুণ ইতিহাস ফুটে ওঠে নজরুলের ক্ষেত্রে। বৃহস্পতিবার (১০ নভেম্বর) ২০২২ সালে আলমাজাল নামক কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে সৌদি যান নজরুল। ৩ বছর ৩ মাস কারাবন্দি থাকার পর, বুধবার (১৪ অক্টোবর) তাঁর সাজা কার্যকর হয়। ছেলে কারাগারে থাকাকালে কথা বললেও, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে পরিবারকে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি।

আর মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন মা রহিমা বেগম। সন্তান হারানোর বেদনায় মা রহিমা বেগম এখন আকুল আকুতি জানাচ্ছেন। অন্তত নজরুলের মরদেহটি যেন দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে সরকার।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে টাঙ্গাইলে সুইটি আক্তারের পরিবার। তাদের দাবি, কাজের জায়গায় মারামারির ঘটনায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) শেষবার কথা হলেও, সুইটির এমন পরিণতির কারণ সম্বন্ধে নিশ্চিত নয় পরিবার।

আর মেয়ের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছে পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি সুইটির মৃত্যুর খবর যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে যেন তার মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

কোনো তথ্য না জানিয়ে এই শাস্তি কার্যকর করায় আন্তর্জাতিক আইন ও ভিয়েনা কনভেনশন অন কনসুলার রিলেশনসের ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদের ধারা গুরুতর লঙ্ঘন হয়েছে বলে মনে করছে আইন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে, শনিবার (১৭ অক্টোবর) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, এই ঘটনায় সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পায়নি। পরবর্তীতে রবিবার (১৮ অক্টোবর) সৌদি রাষ্ট্রদূতকে তলব কোরে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ডিপ্লোমেটিক লেটার পাঠালেও এখনো স্পষ্ট জবাব মেলেনি।

নারী গৃহকর্মীদের নির্যাতন ও মৃত্যু

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, সৌদি আরবে ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার নামে যদি এত দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে, তবে বছরের পর বছর যৌন নিপীড়ন, মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়া বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের ন্যায়বিচারের পাল্লা কতটা কার্যকর?

ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের উপাত্ত বিশ্লেষণে এক ভয়ংকর তথ্য সামনে এসেছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময়ে, সৌদি আরব থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে ২৫০ জন বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীর মরদেহ। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই মৃত ফিরতে হয়েছে ১৩ জনকে।

তথ্য বলছে, বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি সৌদি আরবে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে আত্মহত্যা করেছে ৬৪ জন বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মী, যা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ঘটা বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের মোট আত্মহত্যার ৭৬ শতাংশ।

দীর্ঘ ৯ মাস সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক তরুণী শিউরে ওঠার মতো নির্যাতনের সেই নির্মম বর্ণনা দিয়েছিলেন এর আগে।

ভালো কাজের লোভে সৌদি আরব গিয়েও নিস্তার মেলেনি তাঁর। অফিসে কাজের কথা বলে গৃহকর্মীর কাজ, ২৪ ঘণ্টা খাটুনি, না খাইয়ে রাখা আর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাঁকে।

প্রাণ বাঁচাতে প্রথমে বাড়ি থেকে পালালেও রক্ষা পাননি; পড়ে যান অন্য চক্রের খপ্পরে। সেখানে তাঁকে বাধ্য করা হয় পতিতাবৃত্তিতে। পরবর্তীতে পুলিশ আটক করলেও মেলেনি নিস্তার, জেলেও চলে নির্যাতন। অবশেষে গর্ভবতী অবস্থায় নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরত আসতে হয় তাকে।

দেশের অসংখ্য নারীর অসহায়ত্ব ও জীবনসংগ্রামকে পুঁজি করে তাদের ওপর ধারাবাহিকভাবে চালানো হয়েছে পৈশাচিক যৌন নির্যাতন।

এছাড়াও, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের অনেক নারী ফিরতে পারেনি দেশে, তবে রেখে গেছেন ভয়াবহ নির্যাতনের বার্তা।

দেশের তৈরি পোশাক খাতে মৃত্যু ও নির্যাতন

বিদেশের মাটিতে যে অবহেলা, দেশের ভেতরে চিত্র কি তার চেয়ে ভিন্ন? শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় ডেকো গ্রুপের, আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে ঘটে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। অসুস্থ শরীরে ছুটির আকুতি জানিয়েও, তা পাননি দয়া সুইং অপারেটর সুমি আক্তার।

কারখানার সিসিটিভি ফুটেজ বলছে, বেলা ৫টা ১ মিনিট ৯ সেকেন্ডে অসুস্থ সুমি টেবিলে কাজ করছিলেন। ঠিক ৫টা ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে এক কর্মকর্তা তেড়ে এসে সেলাই মেশিনে আঘাত করেন, অমানবিক ধমক দেন এবং সুমির হাতে থাকা কাজের সরঞ্জাম মাটিতে ছুড়ে ফেলেন। সেই পৈশাচিক আঘাতে, মানসিকভাবে ভেঙে পড়া সুমি, ঠিক ২০ সেকেন্ডের মাথায়, অর্থাৎ ৫টা ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে, কাজের টেবিল থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে মেডিক্যাল সেন্টারে মেলে তাঁর নিথর দেহ।

এর ঠিক দুই দিন আগে, বুধবার (১৪ অক্টোবর) আশুলিয়ার শারমিন গ্রুপে ঘটে আরেক মর্মান্তিক ঘটনা। ১০ তলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যু হয় ৩৯ বছর বয়সী সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার মো. জামালউদ্দিনের।

স্বজনদের দাবি, শিপমেন্ট বাতিল নিয়ে জিএম মারুফ জুয়েলকে আটকের প্রতিবাদ করায় জামালকে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। জামালের স্বজনরা এটিকে আত্মহত্যা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা হিসেবে অভিযোগ করেছে।

তবে, সুমি কিংবা জামাল একা নন। তৈরি পোশাক খাতে অমানবিক অত্যাচার আর মৃত্যুর এই মিছিল যেন এক নিয়মিত পরিণতিতে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে কর্মক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন ৮,৭৩২ জন শ্রমিক। আর কেবল ২০২৫ সালেই কর্মস্থলে মৃত্যু হয়েছে ৭৩৫ জনের।

ন্যায্য পাওনা আর বেতন-ভাতার দাবিতে বারবার শ্রমিকদের রাজপথে নামতে হয়। কিন্তু, শ্রমিকদের এই রক্তঝরানো পরিশ্রমের হাজার হাজার কোটি টাকা আসলে যায় কোথায়?

অভিযোগ রয়েছে, পোশাক খাতের অঢেল লাভ ও শ্রমিকের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে অর্জিত অর্থ, ব্যাংকিং জালিয়াতি ও নানা অপকৌশলে বিদেশে পাচার করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

সচেতন মহলের দাবি, গরিব শ্রমিকের জীবন, বিদেশে কাজ করতে যাওয়া নারীর নিরাপত্তা এবং মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়া প্রবাসীর ন্যায়বিচার—কোনোটিই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অপরাধী যে-ই হোক, অর্থ বা ক্ষমতার জোরে পার পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

আইন যদি সবার জন্য সমান হয়, তবে তা কি শুধুই বলির পাঁঠা গরিব প্রবাসীর ওপর প্রয়োগ হবে, নাকি প্রবাসের নির্যাতক আর দেশের অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধেও একই শক্তিতে কার্যকর হবে? সময়ের কাছে এই প্রশ্ন বড্ড ভারী।

দেশ-বিদেশ মিলিয়ে সামগ্রিক শ্রমশক্তির এই বিশাল ক্যানভাসে, বর্তমানে বাংলাদেশিদের মোট শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৯ কোটি। এই বিশাল শক্তিকে অবহেলা করে কোনো জাতির সমৃদ্ধি সম্ভব নয়, বলেই মনে করে বিশেষজ্ঞরা।

ঘাম আর রক্তে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ও তৈরি পোশাক খাতের হাত ধরেই যে অর্থনীতির মূল ভিত্তি, সেই শ্রমশক্তির নিরাপত্তা ও সম্মান যখন প্রবাস কিংবা নিজ দেশে ক্ষুণ্ণ হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা নিয়ে। বলির পাঁঠা হওয়া এসব মেহনতি মানুষের জীবনের মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে, সামগ্রিক উন্নয়ন যে কেবলই এক কাচের মহল, সময় বারবার যেন সেই নির্মম সত্যকেই আঙুল দিয়ে, দেখিয়ে দিচ্ছে।