হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ১৬ ডিসেম্বর চালুর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিতে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়দায়িত্ব, রাজস্ব ভাগাভাগি, আইনি সুরক্ষা এবং প্রকল্পের ত্রুটি সংশোধনের সময়সীমা নিয়ে দুই পক্ষের মতবিরোধ রয়ে গেছে। দুই বছরে ২০ দফার বেশি বৈঠক করেও সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। বিষয়টি এখন সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি টার্মিনাল চালুর প্রথম দিনে কতটি ফ্লাইট পরিচালিত হবে, তা নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। বেবিচক প্রথম দিন অন্তত ১০টি নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করতে চায়। অন্যদিকে, জাপানি কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব চারটি ফ্লাইটের, যার মধ্যে দুটি আগমন ও দুটি বহির্গমন। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আগামী ৩ নভেম্বর স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, শুরু থেকেই বিকল্প অপারেটর নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন ছিল। এতে দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারত। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তির আর্থিক শর্ত, পরিচালন ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে টার্মিনাল চালু করা জরুরি হলেও দেশের স্বার্থ ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিশ্চিত না করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা উচিত হবে না।
বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা শেষ হয়েছে। নতুন কিছু শর্ত এসেছে। এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। বিষয়টি জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সরকারের সবুজ সংকেত পাওয়া গেলে চুক্তি চূড়ান্ত হবে বলে আশা করছেন তিনি।
বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনাল উদ্বোধনের লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব চুক্তি সইয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
চার শর্তে সমঝোতা হয়নি
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) চুক্তি করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চারটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তে সমঝোতা না হওয়ায় চুক্তি চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না।
প্রথমত, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়দায়িত্ব ও ঝুঁকি বণ্টন নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। জাপানি কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব অনুযায়ী, এ কার্যক্রমের সার্বিক দায়দায়িত্ব ও ঝুঁকি বহন করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তবে বিমানের আয়ের অংশ কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। ফলে কার্যক্রমের দায়ভার, আর্থিক সুবিধা ও সম্ভাব্য ক্ষতির দায় কীভাবে ভাগ হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
দ্বিতীয়ত, রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। আগে বাংলাদেশকে ২৭ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার কথা থাকলেও পরিচালন প্রস্তুতির প্রথম আট মাসে সাড়ে ১৩ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছে জাপানি পক্ষ। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে ওই সময়ে বাংলাদেশের রাজস্বের অংশ নির্ধারিত হারের তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসবে।
তৃতীয়ত, আইনি সুরক্ষা ও বাংলাদেশের আইন প্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন। জাপানি কনসোর্টিয়াম চুক্তির আওতায় বিশেষ আইনি সুবিধা ও দায়মুক্তি চেয়েছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকার সাধারণ কোনো আইন প্রণয়ন কিংবা বিদ্যমান আইন সংশোধন করলে তা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অবস্থান হলো, দেশের প্রচলিত আইন এবং ভবিষ্যতে সাধারণভাবে প্রযোজ্য আইনি পরিবর্তনের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না। এ ধরনের ছাড়ের ফলে আইন প্রয়োগ, বিরোধ নিষ্পত্তি ও দায় নির্ধারণে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, প্রকল্পের ত্রুটি সংশোধনের দায়বদ্ধতার সময়সীমা বা ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (ডিএলপি) নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ এ সময়সীমা নয় মাস নির্ধারণ করতে চায়। জাপানি কনসোর্টিয়াম তা বাড়িয়ে ১২ মাস করার দাবিতে অনড় রয়েছে।
বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অগ্রিম অর্থ পরিশোধ, আইনি সুরক্ষা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের অর্থ পরিশোধ এবং যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে দায়দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়েও নতুন শর্ত তোলা হচ্ছে। আগে যন্ত্রাংশের দায়দায়িত্বের মেয়াদ ছয় মাসের কথা থাকলেও এখন ১২ মাস পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এসব বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় বেবিচক আলোচনার অগ্রগতি ও অমীমাংসিত শর্তগুলো লিখিতভাবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে।
বিকল্প অপারেটর নিয়ে প্রশ্ন
তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে বিকল্প আন্তর্জাতিক অপারেটরকে বিবেচনায় না নেওয়ায় দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা শক্তিশালী ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিকল্প ব্যবস্থাপনার কার্যকর পরিকল্পনা থাকলে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারত।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন সরকার জানিয়েছিল, জাপানি কনসোর্টিয়াম শর্ত মেনে চুক্তি করতে রাজি না হলে অন্য আন্তর্জাতিক অপারেটর খোঁজা হবে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাও বলেছিলেন, সমঝোতা না হলে দেশের স্বার্থ বিবেচনায় বিকল্প অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
পরবর্তী সময়ে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় বিকল্প অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ এগোয়নি। তবে শেষ মুহূর্তে নতুন কিছু শর্ত সামনে আসায় চুক্তি আবার জটিলতায় পড়েছে।
বিকল্প অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হলে নতুন করে দরপত্র, কারিগরি মূল্যায়ন, আর্থিক আলোচনা ও চুক্তি সম্পাদনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে টার্মিনাল চালুর সময়সূচিতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে টার্মিনাল চালু করা এবং চুক্তির শর্তে দেশের স্বার্থ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়টি সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চুক্তি সইয়ে লাগতে পারে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত
আলোচনা শেষ হলেও চুক্তি সইয়ের আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা বাকি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানান, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে তৃতীয় টার্মিনালের পরীক্ষামূলক উদ্বোধনের পরিকল্পনার সঙ্গে চুক্তি সইয়ের বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত নয়। উদ্বোধনী আয়োজনের প্রস্তুতির জন্য পৃথক একটি কমিটি কাজ করছে।
টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি সইয়ের তারিখ এবং প্রথম দিনে ফ্লাইট পরিচালনার সংখ্যা চূড়ান্ত করতে আগামী ৩ নভেম্বর স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে দুই বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এখন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে চুক্তির পরবর্তী অগ্রগতি। পরিচালনার দায়িত্ব, রাজস্ব ভাগাভাগি, ঝুঁকি বণ্টন এবং আইনি দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তার ওপর প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও পরিচালনগত স্বার্থ নির্ভর করছে।
আরও পড়ুন:







