শনিবার

২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৯ কার্তিক, ১৪৩৩

জুলাই আন্দোলনে আহতের মামলা, তদন্তে মিলল সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:০৬

শেয়ার

জুলাই আন্দোলনে আহতের মামলা, তদন্তে মিলল সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য
ছবি সংগৃহীত

জুলাই আন্দোলনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলায় আহত হওয়ার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলার তদন্তে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার বাদী জাফর আহমেদ ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই রাজধানীর বিজয় সরণি মোড়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হন। পারিবারিক মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে শিক্ষক, কর্মচারী ও এলাকার বাসিন্দাদের হয়রানি করতে তিনি মামলাটি করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

২০২৫ সালের ১৫ মার্চ আদালতে মামলাটি করেন জাফর আহমেদ। এতে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়। আসামিদের অধিকাংশের বাড়ি মাদারীপুরের শিবচর এলাকায়।

মামলার এজাহারে জাফর আহমেদ অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাঁর ওপর হামলা করেন। এ সময় তিনি পুলিশের একটি গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যান। এরপর তাঁর ওপর আবারও হামলা চালানো হলে তিনি জ্ঞান হারান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ আগস্টের পর তাঁর পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।

বাদীর দাবি ছিল, আসামিরা সবাই নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁদের কয়েকজন ঘটনার সময় ঢাকায় অবস্থান করছিলেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

তদন্তে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য

মামলার প্রায় দেড় বছর পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আকরামুজ্জামান জানান, তদন্তে দেখা গেছে, এটি জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার ঘটনা নয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই সকাল ৭টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর বিজয় সরণি মোড়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হন জাফর আহমেদ। দুর্ঘটনার পর তিনি এক পরিচিতজনকে ফোন করে মোটরসাইকেলটি বাসায় পৌঁছে দিতে বলেন। হাসপাতালে ভর্তির চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্র এবং জুলাই আন্দোলনের গেজেট পর্যালোচনা করেও আন্দোলনে আহত হওয়ার দাবির পক্ষে কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাফর আহমেদের বাবা ১৯৭০ সালে মাদারীপুরের শিবচরে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। বাবার মৃত্যুর পর মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে জাফর আহমেদের সঙ্গে তাঁর মা, বড় ভাই ও শিক্ষকদের বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে স্বজন ও স্থানীয়রা তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিলে কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর তীব্র মনোমালিন্য তৈরি হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, বাবার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারী ও বিরোধী পক্ষকে ফাঁসানো এবং প্রতিষ্ঠানে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বিবরণ দিয়ে মামলাটি করা হয়েছিল। এজাহারে উল্লেখ করা তারিখে আসামিদের কেউই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

মামলার ৪ নম্বর আসামি ও মাদ্রাসাটির শিক্ষক হেলাল উদ্দিন জানান, তাঁরা বাদীর বাবার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর জাফর আহমেদ হুইলচেয়ারে করে মাদ্রাসায় এলে তাঁরাই তাঁকে ধরে দোতলায় তুলে দেন। ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে তাঁদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হয়েছে এবং আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাঁদের অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আগামী ২ নভেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।