রাজধানীর তেজগাঁও সরকারি শিশু পরিবারে দায়িত্বে অবহেলা, তদারকির ঘাটতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গত ছয় মাসে দুই কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়া, আবাস থেকে বাইরে গিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া এবং শিশুদের দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাবেক ও বর্তমান নিবাসী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ছোট মেয়েরা দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো খালাম্মা ছাড়াই একা একা স্কুলে যাচ্ছে। শিশু পরিবারের ফটকে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে তাদের যাতায়াতের তথ্য নিতে দেখা যায়নি। তেজগাঁও আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে যাতায়াতের সময়ও মেয়েদের একা রাস্তা পার হতে দেখা গেছে।
শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক সানজিদা আয়েশা জানান, সেখানে আটজন খালাম্মা থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আছেন মাত্র দুজন। এ কারণে সব সময় শিশুদের সঙ্গে কাউকে পাঠানো সম্ভব হয় না।
শিশু পরিবারের প্রধান ফটকের সামনের প্রায় ৫০০ মিটার সড়কের দুই পাশে টিনের ঘরে অনেক উদ্বাস্তু পরিবার বসবাস করে। সড়কের পাশে সারি সারি ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের আনাগোনাও রয়েছে। এই পথ দিয়েই মেয়েদের স্কুলে যাতায়াত করতে হয়। পথে কয়েকবার মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানান সানজিদা আয়েশা।
তিনি বলেন, বাইরের পরিবেশ নিয়ে অধিদপ্তরে তিন দফায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো সমাধান হয়নি।
সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর বিষয়টি ধরা পড়ে
শিশু পরিবারের কয়েকজন সাবেক নিবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত সেপ্টেম্বরে এক কিশোরীর শারীরিক অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে চিকিৎসা পরীক্ষায় সে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানা যায়। একপর্যায়ে ওই কিশোরী তার প্রেমিকের মাধ্যমে গর্ভবতী হওয়ার কথা স্বীকার করে।
সাবেক নিবাসীদের অভিযোগ, কিশোরীর প্রেমিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় তাকে মুসলিম বানিয়ে ওই কিশোরীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। পরে রাতের আঁধারে তাকে আবাস থেকে বের করে দেওয়া হয়।
শিশু পরিবারের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক শাহজাহান আকন্দ কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও রাতে তাকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, ওই কিশোরী ছুটি নিয়ে আবাস থেকে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেনি। মেয়েটির অভিভাবকেরাই তার বিয়ে দিয়েছেন।
উপতত্ত্বাবধায়ক সানজিদা আয়েশা বলেন, এখানে কিশোরী বয়সী মেয়েরা থাকে। তাদের কারও সঙ্গে বাইরের কারও সম্পর্ক থাকলে সব ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের কিছু করার থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের ডেকে সমাধানের চেষ্টা করা হয়।
কিশোরীর প্রেমিককে জোর করে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে সানজিদা আয়েশা বলেন, মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হলে তদন্ত করে এ বিষয়ে জবাব দেওয়া হবে।
সানজিদা আয়েশা জানান, প্রতি মঙ্গলবার মেয়েদের শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। তবে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার সাত মাস পরও বিষয়টি কীভাবে শনাক্ত করা গেল না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেউ বাইরে গিয়ে কিছু করে এলে চিকিৎসা পরীক্ষা ছাড়া তা শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
শিক্ষকের বাসায় যাতায়াত নিয়ে অভিযোগ
কয়েকজন সাবেক নিবাসীর অভিযোগ, শিশু পরিবারের পাশের বিজি প্রেস হাইস্কুলের একজন নারী শিক্ষক উঠতি বয়সের কয়েকজন মেয়েকে নিয়মিত নিজের বাসায় নিয়ে যেতেন। নিয়ম অনুযায়ী, আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়কের অনুমতি প্রয়োজন। তবে লিখিত অনুমতি ছাড়াই একাধিক মেয়ে ওই শিক্ষকের বাসায় যেত বলে দাবি করেছেন সাবেক নিবাসীরা।
তাঁদের অভিযোগ, এমনই এক কিশোরী গত জুলাই মাসে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। তার চিকিৎসা পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলে ওই কিশোরী শিশু পরিবার ছেড়ে চলে যায়।
সহকারী তত্ত্বাবধায়ক শাহজাহান আকন্দ এ ধরনের ঘটনার কথা অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য, স্কুলের ওই শিক্ষকের নিজের কোনো মেয়ে সন্তান নেই। তাই স্কুল বন্ধের সময় তিনি মেয়েদের বাসায় নিয়ে গিয়ে পড়ান। পরে শিক্ষক নিজেই তাদের শিশু পরিবারে পৌঁছে দেন।
শাহজাহান আকন্দ নিজেও কয়েকজন মেয়েকে নিয়মিত নিজের বাসায় নিয়ে যান বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক কয়েকজন নিবাসী। তবে তিনি এ অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।
আবাস থেকে পালিয়ে যাওয়া তিন মেয়েকে উদ্ধার
গত সেপ্টেম্বরে অনাদর ও অবহেলা সহ্য করতে না পেরে অভিভাবকহীন তিনটি মেয়ে শিশু পরিবার থেকে পালিয়ে যায়। পরদিন পুলিশ তাদের রাস্তা থেকে উদ্ধার করে আবাসে ফিরিয়ে আনে বলে জানা গেছে।
শাহজাহান আকন্দ মেয়েদের পালিয়ে যাওয়া ও পুলিশের মাধ্যমে উদ্ধারের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, দুটি মেয়ে একসঙ্গে পালিয়ে গেলেও পুলিশ সেদিনই তাদের উদ্ধার করে। অন্য মেয়েটি অনেক আগে পালিয়েছিল। তবে তাঁর দাবি, তাদের কেউ নির্যাতনের শিকার হয়নি।
উপতত্ত্বাবধায়ক সানজিদা আয়েশা বলেন, অনেক সময় পথশিশু এবং অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ রয়েছে এমন শিশুদের আদালতের মাধ্যমে শিশু পরিবারে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে ঘন ঘন পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে।
শিশু পরিবারের সাবেক দুই বাসিন্দার অভিযোগ, পুরুষ কর্মী হিসেবে শাহজাহান আকন্দের মেয়েদের আবাসিক কক্ষে প্রবেশের অনুমতি না থাকলেও তিনি প্রায়ই কাউকে কিছু না জানিয়ে সেখানে ঢুকে পড়তেন। এতে মেয়েরা অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ত।
তবে শাহজাহান আকন্দ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কখনো একা মেয়েদের আবাসিক কক্ষে প্রবেশ করেন না।
মেয়েদের আবাসে পুরুষ কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
সাধারণত শুধু মেয়েদের জন্য পরিচালিত শিশু পরিবারে দারোয়ান ছাড়া কোনো পুরুষ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদায়ন করা হয় না। তবে শাহজাহান আকন্দ প্রথম পুরুষ কর্মকর্তা হিসেবে তেজগাঁও শিশু পরিবারে যোগ দেন বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
তিনি দাবি করেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাবেক একজন মহাপরিচালক তেজগাঁও শিশু পরিবারের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব দিয়ে তাঁকে খাগড়াছড়ি থেকে এখানে নিয়ে আসেন।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাঁর স্ত্রী দুই বছর আগে তেজগাঁও শিশু পরিবারে চাকরি করতেন। স্ত্রীর সঙ্গে থাকার জন্য শাহজাহান আকন্দের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে খাগড়াছড়ি থেকে তেজগাঁও শিশু পরিবারে বদলি করা হয়।
শিশু পরিবারটিতে ১৪ বছর ধরে দারোয়ানের কাজ করছেন মহিবুল ইসলাম। তিনি জানান, চাকরিজীবনে এখানে কোনো পুরুষ সহকারী তত্ত্বাবধায়ক দেখেননি। শাহজাহান আকন্দই প্রথম পুরুষ হিসেবে এ দায়িত্বে যোগ দেন।
শিশু পরিবারে সাংবাদিক পরিচয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে শাহজাহান আকন্দকে ফরিদপুর শিশু পরিবারে বদলি করা হয়। সেটিও মেয়েদের আবাস।
তাঁকে আবারও মেয়েদের আবাসে বদলি করার কারণ জানতে চাইলে ঢাকা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক আয়েশা আক্তার বলেন, সংশ্লিষ্ট পদে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা কম। এ কারণে ফরিদপুরের শূন্যপদে তাঁকে বদলি করা হয়েছে।
তেজগাঁও শিশু পরিবারে মেয়েদের বসবাস ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আয়েশা আক্তার বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
দেশে শিশুদের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের ৮৫টি আবাস
সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে সারা দেশে অনাথ, দুস্থ ও অভিভাবকহীন শিশুদের জন্য দুই ধরনের মোট ৮৫টি আবাস রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত আসনসংখ্যা ১০ হাজার ৩০০। এর মধ্যে ছোটমণি নিবাসে নবজাতক থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের রাখা হয়। আর শিশু পরিবারে ছয় বছরের বেশি থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
মেয়েদের বয়স ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও অভিভাবক না থাকলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিশেষ অনুমতিতে শিশু পরিবারে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়।
মোট ৮৫টি আবাসের মধ্যে ৪২টি ছেলে শিশু-কিশোরদের জন্য, ৪২টি মেয়ে শিশু-কিশোরীদের জন্য এবং একটি ছেলে ও মেয়ে উভয় শিশুর জন্য পরিচালিত হয়। রাজধানী ঢাকায় মেয়েশিশু ও কিশোরীদের জন্য একমাত্র আবাস তেজগাঁও সরকারি শিশু পরিবার। সেখানে ১৭৫ জনের থাকার ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে বসবাস করছে ১২৭ জন শিশু-কিশোরী।
আরও পড়ুন:







