বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, জনসংখ্যার অনুপাতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ওই বছর দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে মৃত্যুহার ১৮ দশমিক ৬। মোট মৃত্যুর সংখ্যায় বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। অন্যদিকে, রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত হয়েছেন।
সড়কে প্রাণহানির এমন পরিস্থিতির মধ্যে আজ ২২ অক্টোবর পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। ২০১৭ সাল থেকে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ— সবার আগে বাংলাদেশ।
ডব্লিউএইচওর ২০২৩ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
গত মঙ্গলবার ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রামে পাবনা-নাটোর মহাসড়কে ট্রাকের সঙ্গে বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ২০ জনের বেশি। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকর্মীরা দুমড়েমুচড়ে যাওয়া যানবাহন থেকে হতাহতদের উদ্ধার করেন। স্বজনদের কাছে ফেরার পথে প্রাণ হারান অনেকে।
গত বছরের এপ্রিলে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় বাস ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী তাসনিয়া ইসলাম প্রেমা। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁরও মৃত্যু হয়। আরেকটি পরিবারের আট বছর বয়সী আরাধ্যা সড়ক দুর্ঘটনায় হারায় তার মা-বাবাকে।
প্রতি লাখে মৃত্যু ১৮.৬, শীর্ষে থাইল্যান্ড
ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে মৃত্যুহার ১৮ দশমিক ৬। এই হারে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে শুধু থাইল্যান্ড। দেশটিতে প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে মৃত্যুহার ২৫ দশমিক ৪।
তালিকায় বাংলাদেশের পর রয়েছে ইথিওপিয়া ও ভিয়েতনাম। উভয় দেশে প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে মৃত্যুহার ১৭ দশমিক ৭। চীনে এই হার ১৭ দশমিক ৪, নাইজেরিয়ায় ১৭ দশমিক ২, ব্রাজিলে ১৫ দশমিক ৭, ভারতে ১৫ দশমিক ৪, যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ দশমিক ২ এবং পাকিস্তানে ১১ দশমিক ৯।
জনসংখ্যার অনুপাতে মৃত্যুহার একটি দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। মোট জনসংখ্যা বেশি হলে কোনো দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি হতে পারে। অন্যদিকে, প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে মৃত্যুহার জনসংখ্যার তুলনায় প্রাণহানির মাত্রা তুলে ধরে।
তবে ডব্লিউএইচওর দেওয়া ৩১ হাজার ৫৭৮ মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশের সরকারি হিসাবে নথিভুক্ত মৃত্যুর সংখ্যা নয়। এটি বিভিন্ন তথ্য ও মডেলের ভিত্তিতে সংস্থাটির অনুমান। একই প্রতিবেদনে ২০২১ সালে বাংলাদেশের সরকারি সূত্রে জানানো সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৫ হাজার ৮৪। দুই হিসাবের এই বড় ব্যবধান সড়ক দুর্ঘটনায় প্রকৃত প্রাণহানি নিরূপণে তথ্য সংগ্রহ ও হিসাবের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
মোট মৃত্যুর সংখ্যায় ষষ্ঠ বাংলাদেশ
ডব্লিউএইচওর ২০২১ সালের অনুমিত হিসাব অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হওয়া ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ।
তালিকায় প্রথম চীনে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। দ্বিতীয় ভারতে ২ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৮, তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্রে ৪৭ হাজার ৭৫০, চতুর্থ নাইজেরিয়ায় ৩৬ হাজার ৭২২ এবং পঞ্চম ব্রাজিলে ৩৩ হাজার ৫৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশে অনুমিত মৃত্যুর সংখ্যা ৩১ হাজার ৫৭৮। এরপর পাকিস্তানে ২৭ হাজার ৫৬৮, ইথিওপিয়ায় ২১ হাজার ২৫৮, থাইল্যান্ডে ১৮ হাজার ২১৮ এবং ভিয়েতনামে ১৭ হাজার ২২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশীয় পরিসংখ্যানেও উদ্বেগজনক চিত্র
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শিশু ১ হাজার ৮ জন এবং নারী ৯৬২ জন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২ হাজার ৬৭১ জন। পথচারী নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৫৬৪ জন।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অব্যাহত ছিল। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত এবং ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। গড়ে প্রতিদিন প্রাণ গেছে ১৪ জনের। নিহতদের মধ্যে ১৩৯ জন মোটরসাইকেল আরোহী এবং ১০৬ জন পথচারী।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমাতে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, সরকার গঠনের আট মাসের মধ্যেই বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন করা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়কে মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনতে সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, নিরাপদ মোটরযান নিশ্চিত করা, চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, পরীক্ষা কঠোর করা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ মোড় চিহ্নিত করে সেগুলো অপসারণের কাজ চলছে।
দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ
অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং, চালকের অদক্ষতা ও ক্লান্তি, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, সড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশা এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস ও ট্রাকের সঙ্গে ধীরগতির যানবাহনের চলাচল এবং নিরাপদে সড়ক পারাপারের অভাবও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বেপরোয়া গতি পথচারী ও ছোট যানবাহনের যাত্রীদের ঝুঁকিতে ফেলে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, অতিরিক্ত গতি, মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক নকশা ও দুর্বল আইন প্রয়োগ দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
তাঁর মতে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার, উপযোগী অবকাঠামো তৈরি এবং পথচারীদের নিরাপদে চলাচলের ব্যবস্থা করা জরুরি।
একই সড়কে বারবার দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানকার নকশা, গতি নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের চলাচল ও নজরদারির ঘাটতি খুঁজে বের করা প্রয়োজন। চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ, গাড়ির ফিটনেস, কর্মঘণ্টা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও জরুরি।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ইনজামুল হক মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল না কমার অন্যতম কারণ দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগে ঘাটতি এবং সড়ক পরিকল্পনায় মানুষের নিরাপত্তাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া।
তাঁর মতে, একই স্থানে বারবার দুর্ঘটনা ঘটলেও বা একই ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলেও কার্যকর তদন্তের অভাবে মূল কারণগুলো অশনাক্ত থেকে যাচ্ছে। মৃত্যুর মিছিল থামাতে দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করে কারণভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে কার্যকর গতিনিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ, চালকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স পরীক্ষা এবং মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক চলাচলব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পথচারীদের জন্য ফুটপাত ও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানের নকশাগত ত্রুটি দূর করতে হবে। দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থাও বাড়ানো প্রয়োজন।
দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে পুলিশ, বিআরটিএ ও স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা জরুরি। কোন সড়কে, কী ধরনের যানবাহনে, কী কারণে এবং কারা বেশি প্রাণ হারাচ্ছেন, তা নিয়মিত বিশ্লেষণ ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। তদন্তের ফল অনুযায়ী সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্যে নিরাপদ সড়ককে সমৃদ্ধ দেশের শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে আইন ও পরিকল্পনার পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। ডব্লিউএইচওর হিসাবে, জনসংখ্যার অনুপাতে সড়কে মৃত্যুহারে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
আরও পড়ুন:







