বুধবার

২১ অক্টোবর, ২০২৬ ৬ কার্তিক, ১৪৩৩

এমটিএ আইন ২০২৬-এর খসড়ায় পরিবহনের ক্ষমতা এক কর্তৃপক্ষের হাতে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৩৯

শেয়ার

এমটিএ আইন ২০২৬-এর খসড়ায় পরিবহনের ক্ষমতা এক কর্তৃপক্ষের হাতে
ছবি সংগৃহীত

নগর পরিবহন প্রকল্পের অনুমোদন, বাসের রুট ও রুট পারমিট, ফ্র্যাঞ্চাইজি, ভাড়া নির্ধারণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা অডিট ও দুর্ঘটনা তদন্তসহ নগর পরিবহনের বিস্তৃত ক্ষমতা এক কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) পরিবর্তে মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ (এমটিএ) গঠন করে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় এসব ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি নগর পরিবহন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বা ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করার বিধান রাখা হয়েছে। বহুতল ভবন ও আবাসন প্রকল্পের ট্রাফিক পরিকল্পনা অনুমোদনের দায়িত্বও নতুন কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। অনুমোদন ছাড়া প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

২০১২ সালের ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন পরিবর্তন করে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিটিসিএ নতুন আইনের খসড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে জমা দিয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে ডিটিসিএর পরিবর্তে মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ গঠিত হবে।

ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান জানান, মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ আইনের খসড়া প্রায় এক মাস আগে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে। খসড়াটি পর্যালোচনা করে কিছু সংশোধনের বিষয় চিহ্নিত হয়েছে। সংশোধনের পর সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের লিখিত মতামত নেওয়া হবে। এরপর এটি মন্ত্রিসভায় যাবে। সব প্রক্রিয়া ঠিকভাবে এগোলে আইনটি প্রণয়ন করতে আরও প্রায় ছয় মাস লাগতে পারে।

পরিবহন প্রকল্পে আগাম অনুমোদন বাধ্যতামূলক

খসড়া আইনের ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন বা ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর বা সংস্থা নগর পরিবহন উন্নয়ন প্রকল্প নিতে পারবে না।

প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়ার আগেও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। অর্থাৎ কোনো সরকারি সংস্থা নিজস্ব দায়িত্বের আওতায় পরিবহন-সংশ্লিষ্ট প্রকল্প নিতে চাইলেও নতুন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের নেওয়া পরিবহন প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা অনুমোদনের ক্ষমতাও থাকবে এমটিএর হাতে।

এতে একই এলাকায় বিভিন্ন সংস্থার বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নেওয়া কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার পাশাপাশি নতুন একটি অনুমোদন স্তর যুক্ত হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত প্রশাসনিক ধাপ তৈরি হওয়ার বিষয়টিও সামনে আসছে।

বাসের রুট, ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ভাড়া নির্ধারণ

খসড়ায় এমটিএকে বাস রুট পরিকল্পনা, রুট অনুমোদন ও রুট পারমিট, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিকল্পনা, ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তি, ভাড়া নির্ধারণ এবং ভাড়া আদায় ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে নগর পরিবহনের বাস খাতে এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা আরও সরাসরি হবে।

বর্তমানে ঢাকার বাস রুট রেশনালাইজেশনের কাজ ডিটিসিএর মাধ্যমে এগোচ্ছে। নতুন আইনে এসব ক্ষমতাকে আরও বিস্তৃত আইনগত কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। কোন পথে বাস চলবে, কোন কোম্পানি কোন রুট পাবে এবং যাত্রীদের ভাড়া কত হবে, সেসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পাবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বিদ্যমান দায়িত্বের সঙ্গে নতুন কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। রুট পরিকল্পনা ও অনুমোদনের দায়িত্ব এক সংস্থার এবং যানবাহন ও চালকসংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ অন্য সংস্থার হাতে থাকলে দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট না হওয়ার কারণে বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সড়ক নিরাপত্তা ও ট্রাফিক পরিকল্পনায় নতুন দায়িত্ব

খসড়া আইনে সড়ক নিরাপত্তা অডিট ও সড়ক দুর্ঘটনা তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া সড়কের শ্রেণিবিন্যাস, ফুটপাত ও সড়কের মানদণ্ড, যানবাহনের ধরন ও সংখ্যা, গতিসীমা, পার্কিং পরিকল্পনা, ট্রাফিক সিগন্যাল এবং ইন্টারসেকশনের নকশা অনুমোদনের দায়িত্বও নতুন কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

দুর্ঘটনা তদন্তের ফলাফল কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট সড়ক বা অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থাকে কীভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, তা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

খসড়ায় বলা হয়েছে, বহুতল ভবন বা আবাসন প্রকল্পের কারণে আশপাশের সড়কে যানবাহনের চাপ, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং পার্কিং ব্যবস্থার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান অনুমোদন করবে নতুন কর্তৃপক্ষ। ফলে নগর উন্নয়ন ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল ও তদন্তের ক্ষমতা

আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ফৌজদারি শাস্তির পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে খসড়ায়। প্রস্তাব অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ জরিমানা করতে, লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করতে এবং প্রয়োজনে কার্যক্রম স্থগিত করার ব্যবস্থা নিতে পারবে।

কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া পরিবহন প্রকল্প গ্রহণ, ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান ছাড়া নির্দিষ্ট স্থাপনা নির্মাণ এবং অনুমোদন ছাড়া ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য পরিদর্শক নিয়োগের বিধান রয়েছে। তাঁরা পরিবহন অবকাঠামোর পরিকল্পনা ও নথিপত্র পরীক্ষা, তথ্য ও দলিল সংগ্রহ এবং অপরাধ তদন্তে পুলিশের উপপরিদর্শকের মতো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। এসব ক্ষমতা প্রয়োগের শর্ত ও সীমা বিধিমালার মাধ্যমে নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

সওজ, সেতু কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়

নগর এলাকায় পরিবহন অবকাঠামোর বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষসহ একাধিক সরকারি সংস্থা যুক্ত থাকে। খসড়া আইনে নগর পরিবহন প্রকল্প গ্রহণের আগে এসব সংস্থাকেও নতুন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে খসড়ায়। সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বও নির্ধারণ করতে পারবে।

তবে বিআরটিএ, সওজ, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি করপোরেশন ও পুলিশের বিদ্যমান দায়িত্বের সঙ্গে নতুন কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার সীমা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ডিটিসিএর সম্পদ ও দায় যাবে নতুন কর্তৃপক্ষের অধীনে

প্রস্তাবিত আইনের ৫০ ধারায় ২০১২ সালের ডিটিসিএ আইন বিলুপ্ত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিটিসিএর সম্পদ, অধিকার, ক্ষমতা, বিনিয়োগ, নথি, দায়, চুক্তি, চলমান মামলা, বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্মচারীদের নতুন কর্তৃপক্ষের অধীনে নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ ডিটিসিএর বিদ্যমান কাঠামো ও কার্যক্রমের ভিত্তিতেই নতুন কর্তৃপক্ষের যাত্রা শুরু হবে। তবে প্রস্তাবিত আইনে ডিটিসিএর তুলনায় নতুন কর্তৃপক্ষকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খসড়া অনুযায়ী নগর পরিবহনের বড় অংশের ক্ষমতা এক কর্তৃপক্ষের হাতে কেন্দ্রীভূত হবে। বিআরটিএ, সওজ, রাজউক, সিটি করপোরেশন ও পুলিশের সঙ্গে দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট না হলে সমন্বয়হীনতার পরিবর্তে ক্ষমতার ওভারল্যাপ তৈরি হতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ক্ষমতা বাড়াতে গিয়ে নতুন কর্তৃপক্ষকে নগর-পরিকল্পনার প্রধান কর্তৃপক্ষ বানানো হলে তা পুনর্বিবেচনা করা দরকার। ভূমি ব্যবহার ও পরিবহন পরিকল্পনা সমন্বিতভাবে করতে হবে। ডিটিসিএ পরিবহন প্রকল্পগুলোর সমন্বয় করবে, তবে নগর-পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার ও অনুমোদিত পরিকল্পনা যেন উপেক্ষিত না হয়।

তিনি আরও বলেন, ডিটিসিএর নির্দেশনা উপেক্ষা করে বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব উদ্যোগে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ডিটিসিএর ক্ষমতা ও অন্যান্য সংস্থার দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি।