বুধবার

২১ অক্টোবর, ২০২৬ ৬ কার্তিক, ১৪৩৩

প্রবাসীদের পাসপোর্ট ইস্যু নিয়ে মুখোমুখি স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:০৪

শেয়ার

প্রবাসীদের পাসপোর্ট ইস্যু নিয়ে মুখোমুখি স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র
ছবি সংগৃহীত

প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট ইস্যু ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনার এখতিয়ার নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দুই মন্ত্রণালয়ই বিধিবিধানের যুক্তি তুলে ধরে নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। এ নিয়ে গত ১৩ অক্টোবর একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হলেও কোনো সমাধান আসেনি। শিগগিরই আরেকটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানেও সমাধান না হলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ চাওয়া হবে বলে সরকারের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে।

১৯৭৩ সাল থেকে প্রবাসীদের পাসপোর্ট ইস্যু করে আসছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি ভিয়েনা কনভেনশন ও রুলস অব বিজনেসের উল্লেখ করে এ-সংক্রান্ত এখতিয়ার নিজেদের বলে দাবি করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিপরীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবিকে রুলস অব বিজনেস ও সচিবালয় নির্দেশমালার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি

গত ২৮ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাঠানো চিঠিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সৌদি আরব, ওমান ও কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সব ধরনের কনস্যুলার সেবা দ্রুত ও সহজ করতে সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লেষ ছাড়াই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ওই তিন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবা দেওয়ার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। আগামী নভেম্বরের মধ্যে এটি চালু হতে পারে।

চিঠিতে বলা হয়, সৌদি আরবে পাসপোর্ট সেবা নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সীমিত জনবল দিয়ে প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে সেবা দিতে হয়। বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী প্রবাসীদের কনস্যুলার ও অন্যান্য কল্যাণমূলক সেবা দ্রুত ও সহজ করার বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ কারণে সৌদি আরবে ৪০টি, ওমানে ১৫টি এবং কাতারে ১০টিসহ মোট ৬৫টি নতুন এনরোলমেন্ট স্টেশন বা নিবন্ধন কেন্দ্র স্থাপন প্রয়োজন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত পাসপোর্ট ও ভিসা উইং সরাসরি দূতাবাসপ্রধানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন-১৯৬১-এর অনুচ্ছেদ ৩ এবং কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন-১৯৬৩-এর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবা দেওয়ার দায়িত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন দূতাবাস বা দূতাবাসপ্রধানদের। এ ছাড়া রুলস অব বিজনেস-১৯৯৬ অনুযায়ী, এ-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনা হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনি যুক্তি

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আইনি পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ১৩ অক্টোবর আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, সৌদি আরব, ওমান ও কাতারে ৬৫টি অতিরিক্ত ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট ও বায়োমেট্রিক স্টেশন স্থাপনের অনুরোধ জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি সৌদি আরবে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে আল মামাল লজিস্টিকসের স্থলাভিষিক্ত নতুন সংস্থাকে নিজস্ব কর্তৃত্বে অনুমোদন দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বিদেশে পাসপোর্ট ও ভিসা উইং-সংক্রান্ত সব কাজ পরিচালনার একক এখতিয়ার দাবি করেছে মন্ত্রণালয়টি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনি ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এসব দাবিকে সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদ, রাষ্ট্রপতির জারি করা রুলস অব বিজনেস-১৯৯৬-এর ২০২৫ সালের সংশোধনী এবং সচিবালয় নির্দেশমালা-২০২৪-এর পরিপন্থী বলে দেখা গেছে। বিদেশে অবস্থিত পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ের প্রশাসন, আউটসোর্সিং চুক্তি, জনবল নিয়োগ এবং বায়োমেট্রিক তথ্যের নিরাপত্তাসংক্রান্ত সার্বিক কার্যক্রম ও সংবিধিবদ্ধ এখতিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী বিদেশে বাংলাদেশি মিশনগুলোর কনস্যুলার দায়িত্ব ও পাসপোর্ট-সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন হলেও সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি দ্বৈতবাদী রাষ্ট্র। এ কারণে আন্তর্জাতিক চুক্তি বা কনভেনশন দেশের অভ্যন্তরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয় না এবং দেশের আইন বা প্রজ্ঞাপনের ওপর প্রাধান্য পায় না বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ভিয়েনা কনভেনশনের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলো স্বাগতিক রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে প্রেরক রাষ্ট্রের কূটনৈতিক অধিকার নির্ধারণ করে। তবে প্রেরক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কোন মন্ত্রণালয় দায়িত্ব পালন করবে, তা আন্তর্জাতিক আইন নির্ধারণ করে না। মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার নির্ধারণের একমাত্র নথি রুলস অব বিজনেস উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এর লঙ্ঘনের বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানানো হবে।

সমাধানে হয়নি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক

এ বিরোধ নিষ্পত্তিতে গত ১৩ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে সভায় অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উভয় পক্ষ নিজ নিজ যুক্তি তুলে ধরলেও সমাধান হয়নি। শিগগিরই আবার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, পাসপোর্ট ইস্যুর একমাত্র সরকারি কর্তৃপক্ষ ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা। পাসপোর্ট-সংক্রান্ত কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ও স্বরাষ্ট্র। অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ও কার্যপরিধিও নির্ধারিত রয়েছে।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই মন্ত্রণালয়ই রুলস অব বিজনেস অনুসারে পরিচালিত হয়। মূল বিরোধটি প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবা দ্রুত ও সহজ করতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এজেন্ট নিয়োগের এখতিয়ার নিয়ে। এ নিয়োগ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তবে এ ক্ষেত্রে একক কর্তৃত্ব চায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।