বুধবার

২১ অক্টোবর, ২০২৬ ৬ কার্তিক, ১৪৩৩

মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন প্রকল্পে ৮৩৮ ফ্ল্যাটে প্রভাবশালীদের দখল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:৪৯

শেয়ার

মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন প্রকল্পে ৮৩৮ ফ্ল্যাটে প্রভাবশালীদের দখল
ছবি সংগৃহীত

ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসনের জন্য গড়ে তোলা প্রকল্পের অধিকাংশ ফ্ল্যাটই পেয়েছেন প্রভাবশালী রাজনীতিক, উচ্চপদস্থ পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সমিতির নেতাদের আত্মীয়স্বজন। রাজধানীর মিরপুর-১৫ এলাকায় বিজয় রাকিন সিটি নামের এই আবাসন প্রকল্পে সমিতির ভাগে পাওয়া ৮৭০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে মাত্র ৩২ জন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা পেয়েছেন ৫৭টি। বাকি ৮৩৮টি ফ্ল্যাট অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে অমুক্তিযোদ্ধা ও প্রভাবশালীদের নামে বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

১৬ দশমিক ২ একর জমির ওপর নির্মিত এই প্রকল্পে মোট ফ্ল্যাটের সংখ্যা ১ হাজার ৯৫০টি। ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অসচ্ছল ও ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির অনুকূলে জমিটি বরাদ্দ দেন।

পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে সমিতির তৎকালীন সভাপতি পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি এ টি আহমেদুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. মোর্শেদুল আলম ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান রাকিনের সঙ্গে ফ্ল্যাট নির্মাণের চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী, ৫৭:৪৩ অনুপাতে ফ্ল্যাট ভাগ হয়। এতে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান পায় ১ হাজার ৮০টি এবং সমিতির ভাগে আসে ৮৭০টি ফ্ল্যাট।

রাজনীতিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নামে ফ্ল্যাট

বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলামের নামে দুটি, শেখ ফজলুল করিম সেলিমের দুই ছেলে ও এক মেয়ের নামে তিনটি এবং আব্দুর রাজ্জাকের দুই ছেলের নামে দুটি ফ্ল্যাট। সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের দুই মেয়ের নামে দুটি, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও তাঁর ভাইদের নামে চারটি, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের স্ত্রীর নামে একটি এবং সাবেক আইনমন্ত্রী প্রয়াত আব্দুল মতিন খসরুর নামে দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে।

এ ছাড়া গোপালগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র কাজী লিয়াকত আলীসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের আরও ২২ জন নেতা ৪০টি ফ্ল্যাট পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ প্রশাসনের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, এ কে এম শহীদুল হক, নূর মোহাম্মদ, নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা ও সৈয়দ বজলুল করিমের নামেও ফ্ল্যাট নিবন্ধিত রয়েছে। তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ উচ্চপদস্থ ২৩ জন পুলিশ কর্মকর্তার নামে বরাদ্দ হয়েছে ৭০টি ফ্ল্যাট। সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও ফ্ল্যাট পেয়েছেন।

বেসামরিক প্রশাসনের সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান ও তাঁর পরিবারের নামে রয়েছে চারটি ফ্ল্যাট। বিচারপতি নাঈমা হায়দারের নামে রয়েছে একটি এবং ২১ জন সাবেক সচিব পেয়েছেন ২১টি ফ্ল্যাট। সব মিলিয়ে ১৩০ জন প্রভাবশালীর দখলে রয়েছে ২১৫টি ফ্ল্যাট।

সমিতির নেতাদের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ

সমিতির তৎকালীন সভাপতি এ টি আহমেদুল হক চৌধুরী নিজের, স্ত্রী ও প্রবাসী দুই মেয়ের নামে ছয়টি ফ্ল্যাট নিয়েছেন। প্রকল্পের প্রকৌশল দলের প্রধান এ টি এম খালেদুজ্জামান মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে ১৫টি ফ্ল্যাট নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদুল আলম নিজের স্ত্রী, শাশুড়ি, শ্যালক, শ্যালিকা, ভাতিজা ও ভাগিনাসহ নিকটাত্মীয়দের নামে ৫৯টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন। এসব ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য ১০৩ কোটি টাকার বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সমিতির বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খ ম আমীর আলী জানান, সমিতির সদস্যদের এসব ফ্ল্যাটের বিপরীতে এককালীন ৯৩ হাজার টাকা এবং নিবন্ধন ফি বাবদ মাত্র ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। ১ হাজার ৫৫৩ ও ১ হাজার ৮৭২ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাটগুলোর প্রতিটির বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত পৌনে দুই কোটি টাকা।

প্রকল্পের নথি ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে ১৫ জন কার্যকরী সদস্য ও ৪৯ জন সাধারণ সদস্য নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে মোর্শেদুল আলম নিজের নামে জমি বরাদ্দ নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে সাধারণ সদস্যদের প্রতিবাদের মুখে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং সমিতির সদস্যদের নামে জমি বরাদ্দ করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, পরে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে অমুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য ও ক্ষমতাচ্যুত সরকারের প্রভাবশালী নেতাদের সমিতির নতুন সদস্য করা হয়। সমিতির বর্তমান ৫১৬ জন সদস্যের মধ্যে ৩৩৪ জনই অমুক্তিযোদ্ধা। মোর্শেদুল আলম নিজেও মুক্তিযোদ্ধা নন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ১৯৬৬ সালের ২৪ মার্চ। সে হিসাবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল পাঁচ বছর।

৩২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্ত শেষে সমাজসেবা অধিদপ্তর সমিতির বর্তমান কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করে প্রশাসক নিয়োগ করেছে। ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাতকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

নতুন প্রশাসক জানান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদুল আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন খাতে মোট ৩২০ কোটি ৯৫ লাখ ৮ হাজার ২৬৭ টাকা লুটপাটের বিবরণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ব্যাংক এশিয়া ও ইস্টার্ন ব্যাংকের এফডিআর ভেঙে ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ, মুক্তিযোদ্ধা পল্লী প্রকল্প নামের হিসাব থেকে ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা, রাকিনের সাইনিং মানি বাবদ ১২ কোটি টাকা, দুটি মাইক্রোবাস বিক্রির ৩৫ লাখ টাকা এবং ভুয়া প্লট বিক্রি করে ৫০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

মোর্শেদুল আলম ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর ছাত্র-জনতার ওপর হামলার একটি মামলায় গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে মুক্তি পান।

প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্ল্যাট ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যাঁরা এভাবে ফ্ল্যাট পেয়েছেন, তাঁদের বরাদ্দ সম্পূর্ণ অবৈধ, কারণ প্রকল্পটি তাঁদের জন্য ছিল না। তাঁদের উচ্ছেদ করা সরকারের দায়িত্ব এবং এর পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

বঞ্চিত ২৩৮ জন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ২০২৫ সালে ফ্ল্যাট বরাদ্দের দাবিতে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। আবেদনটি বর্তমানে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ও উচ্চ আদালত প্রকৃত সদস্যদের তালিকা হালনাগাদ করে ফ্ল্যাট বরাদ্দের নির্দেশনা দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমিতির বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খ ম আমীর আলী বলেন, তাঁরা চান প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের প্রাপ্য ফিরে পান। এ জন্য প্রশাসক কাজ করছেন।

সমিতির প্রশাসক ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধার ঢাকায় মাথা গোঁজার জায়গা নেই, তাঁদের আবাসনের কথা চিন্তা করেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সমিতি সেই আদর্শ থেকে সরে গিয়ে অমুক্তিযোদ্ধাদের ফ্ল্যাট দিয়েছে এবং ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাট চালিয়েছে। ইতিমধ্যে ১০টি ফ্ল্যাট অবৈধ দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।