বৃহস্পতিবার

২২ অক্টোবর, ২০২৬ ৭ কার্তিক, ১৪৩৩

সৌদি রুটে টিকিটের ভাড়া বেড়েছে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:৩৫

শেয়ার

সৌদি রুটে টিকিটের ভাড়া বেড়েছে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত
ছবি সংগৃহীত

সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মাম রুটে ফ্লাইট বন্ধের পর বিকল্প গন্তব্যে ফ্লাইট চালু থাকলেও বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর টিকিটের দাম বেড়েছে। ঢাকা থেকে সৌদি আরবগামী একমুখী টিকিটে আগের তুলনায় ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। চাকরিতে যোগদানের বাধ্যবাধকতা ও ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে বেশি দামে টিকিট কিনছেন তাঁরা।

সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুথিদের হামলা শুরুর আগে ঢাকা থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন রুটে একমুখী টিকিটের দাম ছিল ৫০ হাজার থেকে ৫৫ হাজার টাকা। বর্তমানে বিকল্প ফ্লাইটের টিকিট কিনতে গিয়ে যাত্রীদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে। ঢাকা থেকে ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য গন্তব্যের তুলনায় সৌদি রুটে ভাড়া এমনিতেই বেশি। নতুন করে ভাড়া বাড়ায় প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে।

সোমবার পর্যন্ত ঢাকা থেকে ১২৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে আটকে পড়েছেন ১৯ হাজার ৩৭৭ জন যাত্রী। তাঁদের বড় একটি অংশ বাড়তি দাম দিয়ে বিকল্প রুটের টিকিট কেনার চেষ্টা করছেন। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো বলে অভিযোগ উঠেছে।

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আটকে পড়া যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ না নিয়ে বিকল্প জেদ্দা ও মদিনা রুটে পৌঁছে দিচ্ছে। দেশীয় বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সও জেদ্দা রুটে কিছুসংখ্যক যাত্রীকে সৌদি আরব পৌঁছে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাড়তি টাকা নেওয়া হচ্ছে না।

তবে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এমিরেটস ঢাকা থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করছে না। সংস্থাটি যাত্রীদের টিকিটের টাকা ফেরত দিচ্ছে।

বিকল্প টিকিট কিনতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা

জসিম উদ্দিন নামের এক যাত্রী টাইমস বাংলাদেশকে বলেন, তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কাতার এয়ারওয়েজ তাঁকে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা জানিয়েছে। পরে অন্য এয়ারলাইন্সে টিকিট কিনতে গিয়ে তিনি বেশি ভাড়া দেখতে পান।

কুমিল্লার লালমাই থেকে আসা আতিকুল ইসলাম ইন্ডিগোর ফ্লাইটে টিকিট কেটেছিলেন। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এখন তাঁকে অন্য এয়ারলাইন্সে বেশি দামে টিকিট কিনতে হচ্ছে।

একই জেলার তিতাস থেকে আসা আইনুদ্দিনের ফ্লাইটও ছিল ইন্ডিগোতে। তাঁর গন্তব্য ছিল জেদ্দা। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তিনি কিছুটা অবাক হয়েছেন।

অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি গো জায়ানের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৯ অক্টোবর ঢাকা থেকে মদিনা রুটে টিকিটের ভাড়া সময়ভেদে ৫৮ হাজার ৯২২ থেকে ৬৪ হাজার ৫৯৫ টাকা। এমিরেটস এয়ারলাইন্সে এই রুটের ভাড়া ৬৯ হাজার ৮৮০ থেকে ৭২ হাজার ৮৪৫ টাকা। ওমান এয়ারে ভাড়া দেখানো হচ্ছে ৭৬ হাজার ৬৭১ টাকা।

ঢাকা থেকে জেদ্দা রুটে আগামী ১ নভেম্বরের জন্য গো জায়ানে ইন্ডিগোর সর্বনিম্ন ভাড়া দেখানো হচ্ছে ৫৪ হাজার ৯১৯ টাকা। এয়ার ইন্ডিয়ার ভাড়া ৫৮ হাজার ৭৮১ টাকা, ইজিপ্ট এয়ারের ৫৯ হাজার ৮৩৭ টাকা, কাতার এয়ারওয়েজের ৬৪ হাজার ৮১৪ টাকা, গালফ এয়ারের ৬৭ হাজার ৪৮ টাকা, ওমান এয়ারের ৬৯ হাজার ৯৭২ টাকা, ফ্লাই দুবাইয়ের ৭২ হাজার ২৪৮ টাকা, এমিরেটসের ৭৪ হাজার ৫১ টাকা, সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সের ৭৮ হাজার ৮৭১ টাকা এবং ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের ৮৯ হাজার ২৬ টাকা। এয়ার ইন্ডিয়ার আরেকটি ভাড়া দেখানো হয়েছে ৯০ হাজার ৯০১ টাকা।

অন্যদিকে, অনলাইন ট্রাভেল প্ল্যাটফর্ম শেয়ারট্রিপে ঢাকা থেকে মদিনা রুটে আগামী ২৭ অক্টোবরের জন্য ইন্ডিগোর সর্বনিম্ন ভাড়া দেখানো হচ্ছে ৮০ হাজার ১৬৫ টাকা। আগামী ৩১ অক্টোবরের ফ্লাইটে এয়ার অ্যারাবিয়ার ভাড়া ৯৭ হাজার ৮৭৫ টাকা। একই তারিখে কাতার এয়ারওয়েজের ভাড়া ১ লাখ ২৭৫ টাকা, এয়ার অ্যারাবিয়ার ৯৮ হাজার ২৭৫ টাকা, ওমান এয়ারের ১ লাখ ৩ হাজার ৮৮২ টাকা এবং এমিরেটসের ১ লাখ ৪ হাজার ৮০৭ টাকা।

ভাড়া বাড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার আটাবের সাবেক সভাপতির

অনলাইন এজেন্সিগুলো অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে না বলে দাবি করেছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সাবেক সভাপতি মনজুর মুর্শেদ। তিনি বলেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন রুটে তাঁরা ৫৫ হাজার টাকার বেশি নিচ্ছেন না।

বাস্তবে অনেক বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে বিশেষ পরিস্থিতি চলছে। তাই কেউ কেউ সামান্য বেশি টাকা নিতে পারেন। যুদ্ধাবস্থা স্বাভাবিক হলে টিকিটের দামও ঠিক হয়ে যাবে।

সৌদি প্রবাসীদের অভিযোগ, ট্রাভেল এজেন্সিগুলো অতিরিক্ত টাকা নিলেও সেই টাকার রসিদ দিচ্ছে না। তবে বিকল্প টিকিট পেয়ে গেলে অনেক যাত্রীই সন্তুষ্ট থাকছেন। কারণ, নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে পৌঁছাতে না পারলে তাঁদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

যাত্রীসেবায় ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে প্রায় চার দশক বিপণন বিভাগে কাজ করা ফারুক আহমেদ বলেন, অতীতে ইরাক-ইরান, ইরাক-কুয়েত ও লিবিয়ার যুদ্ধসহ বিভিন্ন বিপর্যয়ের সময় রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স যাত্রীদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করেছে। এ ক্ষেত্রে বিমান মুনাফার কথা চিন্তা করেনি। তবে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো এভাবে চিন্তা করে না।

তিনি আরও বলেন, শুধু টাকা ফেরত দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বিপদে পড়া যাত্রীদের বিকল্প ব্যবস্থা করাও এয়ারলাইন্সগুলোর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নজরদারি বাড়ানো উচিত বলেও মত দেন তিনি।

বেবিচকের সাত নির্দেশনা মানা হচ্ছে না

গত ১৩ অক্টোবর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট পরিচালনাকারী এয়ারলাইন্সগুলোকে সাত দফা নির্দেশনা দিয়েছিল বেবিচক। তবে এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

নির্দেশনায় যাত্রীদের পুনরায় টিকিট বুকিং ও অর্থ ফেরতে সহায়তা এবং বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব ও সময়সূচি পরিবর্তনের তথ্য মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা, ফোনকল, ই-মেইল, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যাত্রীদের জানানোর নির্দেশনাও রয়েছে।

এ ছাড়া ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি, টিকিট বুকিং, অর্থ ফেরত ও অন্যান্য ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে বলা হয়েছে। বিমানবন্দরে পৌঁছে যাওয়া যাত্রীদের বসার জায়গা, পানি ও হালকা খাবারসহ প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

তবে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, তাঁরা আগাম কোনো বিজ্ঞপ্তি বা বার্তা পাচ্ছেন না। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের যাত্রী মঈনুদ্দিন বলেন, বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আধা ঘণ্টা পর তিনি ফ্লাইট বাতিলের খুদে বার্তা পেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, বিমানবন্দরে প্রবেশের পর বাতিল হওয়া ফ্লাইটের যাত্রীরা পানি ও খাবার তো দূরের কথা, ভালো ব্যবহারও পান না।