সোমবার

১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ৪ কার্তিক, ১৪৩৩

সৌদি আরবগামী ফ্লাইট বাতিলে অনিশ্চয়তায় হাজারো বাংলাদেশি কর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:৩৪

শেয়ার

সৌদি আরবগামী ফ্লাইট বাতিলে অনিশ্চয়তায় হাজারো বাংলাদেশি কর্মী
ছবি সংগৃহীত

সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীরা। ছুটি কাটিয়ে দেশে থেকে কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে অনেকেই ভিসার মেয়াদ ও চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। বিকল্প পথে সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে বাড়তি খরচ ও নানা ভোগান্তির মুখেও পড়ছেন তারা।

গতকাল রবিবার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ জনের বেশি যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে তাদের দুর্ভোগের চিত্র পাওয়া যায়। সরেজমিনে দেখা যায়, রিয়াদগামী যাত্রীরা হাতে টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এয়ারলাইনসের কাউন্টারে খোঁজখবর নিচ্ছেন। কেউ ফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছেন, কেউ ট্রলির ওপর মালপত্র নিয়ে বসে আছেন, আবার কেউ খুঁজছেন বিকল্প ফ্লাইট। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসার পর ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন অনেকে।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের মালেক তাদেরই একজন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ২ নম্বর টার্মিনালে ট্রলি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। চোখেমুখে দুশ্চিন্তা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে প্রথম টিকিট বাতিল হয়। এখন দুবাই হয়ে মদিনায় যাচ্ছেন। এতে বাড়তি ৮০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। তার ভাষ্য, এখন যেতে না পারলে মরণ ছাড়া গতি নেই।

কুমিল্লার চান্দিনার মো. শরীফ সরকার তিন মাসের ছুটি কাটিয়ে সৌদি আরবে ফিরতে চাইছেন। আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে আর যেতে পারবেন না, এমন আশঙ্কায় দ্রুত কর্মস্থলে ফেরার চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু রবিবার বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন, সকাল ১১টার রিয়াদ-দাম্মাম ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। পরে তাকে জানানো হয়, রাত সাড়ে ৮টার ফ্লাইটে মদিনা হয়ে দাম্মাম নেওয়া হবে। হতাশা প্রকাশ করে শরীফ সরকার বলেন, যেতে পারবেন কি না, তা আল্লাহ জানেন।

নাটোরের বড়াইগ্রামের আতিকুল ইসলাম প্রথমবারের মতো চাকরি নিয়ে সৌদি আরব যাচ্ছেন। গত ১২ অক্টোবর বিমানবন্দরে এসে তিনি প্রথম ফ্লাইট বাতিলের খবর পান। গতকাল রবিবার দ্বিতীয়বার বিমানবন্দরে এসেও ফ্লাইট কখন ছাড়বে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন। পরে বাবা আদম আলীকে মালপত্রসহ ট্রলির ওপর বসিয়ে রেখে বিকল্প ব্যবস্থার খোঁজে গুলশান-২-এ গালফ এয়ারের কার্যালয়ে যান তিনি।

আদম আলী বলেন, তিনি একজন কৃষক। অনেক আশা নিয়ে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠাচ্ছেন। ছেলে যেতে না পারলে তার আকামা থাকবে না। এতে তিনি চরম বিপাকে পড়বেন।

প্রায় দুই ঘণ্টা পর ফিরে এসে আতিকুল ইসলাম জানান, রাত ৮টায় তার ফ্লাইট নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তাকে অন্য রুটে সৌদি আরবে যেতে হবে।

কুমিল্লার বামনপাড়ার মো. আসাদ বলেন, সৌদি এয়ারলাইনসে রাত ১১টায় তার ফ্লাইট ছিল। কিন্তু ফ্লাইট বাতিলের বিষয়টি তিনি জানতেন না। যেতে না পারলে তার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মো. মাইনুদ্দীনের রাত ১টা ৪০ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইনসের সরাসরি ফ্লাইটে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাকে জানানো হয়েছে, দুবাই হয়ে মদিনায় যেতে হবে। এতে বাড়তি ভাড়া দিতে না হলেও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তিনি।

নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসেছেন সৌদি আরবের রিয়াদপ্রবাসী আব্দুল মান্নান। ছুটি কাটিয়ে রবিবার দুপুরে তার কর্মস্থলে ফেরার কথা ছিল। আগেই টিকিট কেটে যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন, তার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কবে ফিরতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি। নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে চাকরি নিয়ে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কাও করছেন।

আব্দুল মান্নান বলেন, চার মাস আগে দেশে এসেছিলেন। নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন। সৌদি আরবে তার জরুরি কাজ রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ফিরতে না পারলে বড় সমস্যায় পড়তে হবে। ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে যাত্রীদের ভোগান্তি কিছুটা কমত বলে মনে করেন তিনি।

মালেক, শরীফ সরকার, আসাদ কিংবা আব্দুল মান্নানের মতো হাজারো প্রবাসীর যাত্রা আটকে গেছে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে। কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা এসব যাত্রীর কেউ ঢাকায় এসে আটকে গেছেন, আবার কেউ বিকল্প পথে যাওয়ার চেষ্টা করেও নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। বিকল্প রুটের টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক চাপও বাড়ছে।

বাতিল ও স্থগিত ১১৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী ১১৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। এতে ১৮ হাজার ৩৬২ জন যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাতিল ও স্থগিত ফ্লাইটের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট ৫২টি এবং ট্রানজিট ফ্লাইট ৬৬টি।

এ বিষয়ে বেবিচকের সহকারী পরিচালক জনসংযোগ কাওছার মাহমুদ বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ফ্লাইট বাতিলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।

বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রী পাঠানোর চেষ্টা

যাত্রীদের ভোগান্তি কমানো এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা এড়াতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। সৌদি আরবের দাম্মাম ও মদিনাগামী ফ্লাইটে যাত্রীদের পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে বিনা খরচে অন্য ফ্লাইটে যাত্রীদের সমন্বয় করা হবে।

গত সোমবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাদের বিকল্প ফ্লাইটে পাঠানোর চেষ্টা চলছে।

বিদেশযাত্রার ছাড়পত্র কমেছে

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে, গত বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬ জন। এ বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৩২ জনে। অর্থাৎ এক বছরে ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ।

শুধু সৌদি আরবে যাওয়ার ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৪ থেকে কমে হয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৫৬৭ জন। এ ক্ষেত্রে কমার হার প্রায় ৪৬ শতাংশ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরবে গেছেন ৬ লাখের বেশি বাংলাদেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে দেশটি থেকে ৫৮৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি।