মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রবিবার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে নিয়ে এ নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন বিটিভিতে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
এর আগে শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আত্মরক্ষার্থে নিজের লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরার কথা জানান ইশরাক হোসেন। এ ঘটনায় কয়েকটি সংবাদমাধ্যম খণ্ডিত তথ্য ও বিকৃত সংবাদ প্রকাশ করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রবিবার দুপুর ১২টা ২৭ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে ঘটনার ব্যাখ্যা দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন।
মারমুখীভাবে এগিয়ে আসার দাবি ইশরাকের
বিবৃতিতে ইশরাক দাবি করেন, কর্মসূচি চলাকালে একটি অস্থায়ী আস্তানার কাছে পৌঁছালে ৩০ থেকে ৩৫ জন আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি হইচই করে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। এ অবস্থায় সুনির্দিষ্ট হামলার আশঙ্কা এবং জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি ও তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা গাড়ি থেকে নেমে অল্প সময়ের জন্য আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিজস্ব গোয়েন্দা সূত্র থেকে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং মাদক কারবারিদের পক্ষ থেকে ছাদ থেকে আকস্মিক গুলিবর্ষণের আশঙ্কা সম্পর্কে তাঁকে সতর্ক করা হয়েছিল। সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কেটে যাওয়ার পরপরই অস্ত্রটি যথাস্থানে রাখা হয়। আগ্নেয়াস্ত্রটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং আত্মরক্ষার স্বার্থে আইনি কাঠামোর মধ্যে সেটি প্রদর্শন করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
অভিযানে ছয়জন আটক ও মাদক উদ্ধারের দাবি
ইশরাক হোসেন জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরপরই গেন্ডারিয়া থানা-পুলিশকে অবহিত করা হয়। পরে পুলিশের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ও সহায়তায় সন্দেহভাজন আস্তানাগুলোতে যৌথ অভিযান চালানো হয়। এ সময় চার থেকে পাঁচটি অবৈধ ও অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব আস্তানা থেকে হেরোইন বা হেরোইনজাতীয় মাদকদ্রব্য, বিদেশি মদ, মাদক সেবনের সরঞ্জাম, বেশ কিছু দেশীয় ধারালো অস্ত্র, মাদক বিক্রির নগদ অর্থ এবং ছিনতাই করা মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
এ অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছয়জন মাদক কারবারিকে হাতেনাতে আটক করে জব্দ করা আলামতসহ গেন্ডারিয়া থানা-পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে খণ্ডিত তথ্য প্রকাশের অভিযোগ
বিবৃতিতে ইশরাক অভিযোগ করেন, কয়েকটি গণমাধ্যম খণ্ডিত তথ্য ও ফটোকার্ডের মাধ্যমে অপতথ্য এবং বিকৃত সংবাদ প্রকাশ করেছে। তাঁর দাবি, এসব প্রতিবেদনে অভিযানের সাফল্য, পুলিশের ভূমিকা, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার এবং ছয়জন অপরাধী আটকের বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
এভাবে সরকার ও জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রীর অভিযান—এমন খণ্ডিত দৃশ্যকে চটকদার শিরোনামে প্রচার করা স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিপন্থি।
প্রতিমন্ত্রী সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট তুলে ধরার আহ্বান জানান।
গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী কর্মসূচির পটভূমি
ইশরাক হোসেন জানান, ঢাকা-৬ আসনের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই গেন্ডারিয়ার ঘণ্টিঘর, মুন্সিটেক, করাতিটোলা ও আশপাশের এলাকায় মাদক কেনাবেচা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের বিস্তার নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়ে আসছেন তিনি।
তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে এলাকাটি মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান যাতায়াতপথে পরিণত হয়। গত জুন মাসে মাদকসংক্রান্ত সহিংসতায় তিনজন নিরীহ নাগরিক গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা করেন।
ইশরাকের ভাষ্য অনুযায়ী, জনবলসংকট দূর করা এবং মাদকের আস্তানাসংলগ্ন এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট থানাকে আধাসরকারি পত্র বা ডিও লেটার দিয়েছিলেন। তবে উদ্যোগটি এখনো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তিনি আরও জানান, পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাধারণ নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অংশগ্রহণে সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই শনিবার তিনি ওই এলাকায় যান।
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহনশীলতার নীতি পুনর্ব্যক্ত করে ইশরাক বলেন, মাদকের আস্তানা সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা এবং ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত করা জনগণের কাছে তাঁর অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। একটি ঘটনাকে খণ্ডিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করে গড়ে ওঠা সামাজিক আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিবৃতিতে জনস্বার্থে ভবিষ্যতেও মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
আরও পড়ুন:







