রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে যতো বিতর্ক বিশ্বকবি থেকে লেখা চুরির সমালোচনা; এত বিতর্ক কেনো রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে?
মঙ্গলবার (৭ মে ১৮৬১) ভারতের কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তীতে তিনি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন এবং বিশ্বকবি হিসেবে পরিচিতি পান। তবে এই উজ্জ্বল আলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে নানা বিতর্ক। সাহিত্য চুরি, জমিদারি নির্যাতন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা থেকে শুরু করে কট্টর উগ্রতা, এমন নানা অভিযোগ ও বিতর্ক জড়িয়ে আছে তার জীবনের সাথে। এসব বিতর্কিত অধ্যায়ের শুরুতেই যে নামটি উঠে আসে, তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথের দাদা বা প্রপিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর।
দ্বারকানাথ ঠাকুরের উত্থান ও অভিযোগ
দ্বারকানাথ মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাত্র ১৫০ টাকার একজন চাকর ছিলেন। ইংরেজ সাহেবদের মনোরঞ্জন ও বিভিন্ন সেবামূলক ব্যবস্থা করার মাধ্যমে তার উত্থান ঘটেছিল বলে জানা যায়। সেবার পরিধি ছিল ব্যাপক; কলকাতার অবস্থানরত ইংরেজ বাবুদের যৌন চাহিদা পূরণে দ্বারকানাথ বিশেষ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। সপ্তাহে একদিন তাঁর বাসায় মদ ও আফিমের আসর বসত এবং রাতভর আনন্দ-ফূর্তির জন্য ভারতীয় নারীদের রাখা হতো বলেও, বিভিন্ন তথ্য উপাত্তে উঠে আসে।
প্রাথমিক পর্যায়ে নারীদের সংখ্যা কম থাকায়, মনোরঞ্জনের জন্য নিজের পরিবারের নারীদের পর্যন্ত ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে রবীন্দ্রনাথের দাদার বিরুদ্ধে। ইতিহাসবিদ গোলাম আহমেদ মর্তুজার ‘এ এক অন্য ইতিহাস’ গ্রন্থের ‘অসাধারণ দ্বারকানাথ’ অধ্যায়ে ১৪১ পৃষ্ঠায় এবং রবিবার (১৪ নভেম্বর ১৯৯৯) কলকাতার ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় বিশ্বজিৎ রায় ও রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকাশিত কলাম সূত্রে জানা যায়, কলকাতার সোনাগাছিতে দ্বারকানাথ ঠাকুরের মালিকানায় প্রায় ৪৩টি বেশ্যালয় বা যৌনপল্লী পরিচালিত হতো, এছাড়া ছিলো মদ আর আফিমের ব্যবসাও। যে ব্যবসা রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায়ও সচল ছিল।
একইভাবে, অনৈতিক ব্যবসার পাশাপাশি ব্যাংক কেলেঙ্কারির সাথেও জড়িয়ে ছিল রবীন্দ্রনাথের দাদা দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাম। ১৮২৯ সালে কলকাতায় 'ইউনিয়ন ব্যাংক' প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরবর্তীতে ব্যাংকের অর্থ নিজের ব্যবসায় খাটিয়ে বিশাল ঋণ নেন। ঋণের টাকা পরিশোধে ব্যর্থতা ও নানা অনিয়মের কারণে ১৮৪৮ সালে ব্যাংকটি দেউলিয়া ঘোষিত হয়, যা তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অর্থনীতিকে তোলপাড় করে দেয়।
পারিবারিক প্রভাব ও ব্যক্তিজীবনের বিতর্ক
এদিকে, পতিতালয় ও পতিতাদের সাথে এই দীর্ঘ পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সংযোগের প্রভাব রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারায়ও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর জীবনদর্শন সম্পর্কে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত ‘রবিরশ্মি’ গ্রন্থে পূর্বভাগে ৪৬২ ও ৪৬৩ পৃষ্ঠায় পতিতাদের প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি চাঞ্চল্যকর মন্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে বলা হয়েছে, পতিতা হলেও নারীর স্বাভাবিক পবিত্রতা তার ভিতরে প্রচ্ছন্ন থাকে...।
ঠাকুর পরিবারের এই অনৈতিক পরিবেশ ও পতিতা ব্যবসার কারণে পরবর্তী বংশধরদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও অবক্ষয় লক্ষ্য করা যায়। জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত পরিবারের সন্তান সুভো ঠাকুর তাঁর আত্মক্ষয়ে লিখেছিলেন, আমি অগ্রাহ্য করি, অগ্রাহ্য করি বংশের জন্ম গৌরব / অস্বীকার করি নিজেকে তার প্রবাহ-রূপে / স্বীকার করি না নিজের পিতা আর মাতাকে।
এ বিষয়ে সজনীকান্ত দাস ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার মন্তব্যে বলেছিলেন, স্বীকার না করিবারই কথা, পারাটাই খারাপ।
শুধু তাই নয়, ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথের শারীরিক গঠন ও জন্ম পরিচয় নিয়ে ভারতের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মন্তব্য করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের উগ্র সাম্প্রদায়িকতার আসল জন্ম পরিচয় জানতে তাঁর ডিএনএ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এমনকি, ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের সম্পর্ক ও ট্র্যাজেডির ইতিহাসও ছিল বেশ চাঞ্চল্যকর। রবিবার (৯ ডিসেম্বর ১৮৮৩), ২৩ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের সাথে খুলনার ফুলতলার ১০ বছরের বালিকা ভবতারিণী বা মৃণালিনীর বিয়ে হয়। কিন্তু, এরপর পরই তাঁর ভাবী কাদম্বরী দেবীর সাথে পরকীয়ার সম্পর্ক জানাজানি হলে, বিয়ের মাত্র চার মাস পর ১৮৮৪ সালে প্রেমের বিরহে কাদম্বরী দেবী আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করেন।
কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট এবং বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী, অতিরিক্ত আফিম সেবন ছিল তাঁর মৃত্যুর কারণ। আর আফিম হলো একটি শক্তিশালী ও অত্যন্ত আসক্তি সৃষ্টিকারী মাদক। সেসময় ঠাকুর পরিবারের অনুরোধে জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই কোর্ট বসিয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাঁর মরদেহ নিমতলা শ্মশানে দাহ করা হয়েছিল।
জানা যায়, শেষ দিকে রবীন্দ্রনাথের বেশিরভাগ সময় কাটতো পতিতালয়ে। এমনকি সাহিত্য চর্চার জন্যও পতিতালয়ের পাশে একটি ঘরেই জায়গা করে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
আনন্দবাজার পত্রিকার বাংলা ১৪০৬ সালের ২৮শে কার্তিক তারিখে প্রকাশিত বিশ্বজিত রায়ের একটি কলামে বলা হয়েছে, চুরি করে সাহিত্য রচনার মতো পতিতা সাহিত্যের ওপর রবীন্দ্রনাথের মারাত্মক দক্ষতা ছিল। আরো সহজ করে বললে অশ্লীল সাহিত্যের ওপর রবীন্দ্রনাথের পিএইচডি ডিগ্রি ছিল।
এছাড়াও, ১৯২৮ সালে 'অবতার' পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিফিলিস হয়েছে। নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এ বিষয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বর্ষকালের ভেতর কি তার জুলেও ব্যাভিচারিণীর এক দিনের জন্যও অনুতাপ হলো না।
পরবর্তী সময়ে, আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ বইয়ের ১১ নম্বর পৃষ্ঠায় এবং ‘ইতিহাসের নিরীখে রবীন্দ্র-নজরুল চরিত’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ তরুণ বয়স থেকেই সিফিলিস রোগে ভুগতেন। আর সিফিলিস হচ্ছে যৌন সংক্রান্ত একটি রোগ। বহু নারীতে আসক্ত পুরুষের এই রোগটি রবীন্দ্রনাথের নিত্যনৈমিত্তিক পতিতালয় গমনাগমন ও পতিতা সাহিত্যের ওপর তাঁর বিশেষ দক্ষতারই ফল বলে অনেকে মনে করেন।
সাহিত্য চুরি ও নোবেল পুরস্কারের বিতর্ক
ব্যক্তিজীবনের এই বিতর্কের পাশাপাশি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বখ্যাতি এবং নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পেছনেও রয়েছে সাহিত্য চুরি ও জালিয়াতির বিশাল ইতিহাসের আরেক বিতর্ক। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ যে নোবেল পেয়েছিলেন তা মূল গীতাঞ্জলির জন্য নয়; বরং ১৯১২ সালে প্রকাশিত ১০৩টি কবিতার সংকলন 'সং অফারিংস' এর জন্য। যেখানে গীতাঞ্জলি থেকে ৫০টি এবং অন্যান্য গ্রন্থ থেকে ৫০টি কবিতা নেয়া হয়। এসব ইংরেজি অনুবাদ রবীন্দ্রনাথ নিজে করেননি, বরং সি. এফ. অ্যান্ড্রুজ নামের এক লেখক করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসে। যাঁকে কৌশলে 'দীনবন্ধু' নাম দেয়া হয়েছিল, যা রবীন্দ্রনাথ কখনো স্বীকার করেননি।
'সং অফারিংস'-এর ভূমিকায় ইংলিশ কবি ইয়েটস উল্লেখ করেন যে, ২৬ নম্বর কবিতার সাথে বাইবেলের 'সং অফ সলোমন' এর ৮৬ নম্বর কবিতার সাথে সেন্ট ফ্রান্সিসের 'ক্যান্টিকেল' গানের মিল রয়েছে। বিখ্যাত 'উর্বশী' কবিতাটি চার্চ সুইনবার্নের রচনা থেকে চুরি করা। 'চিত্রা' কাব্যের 'এবার ফেরাও মোরে' এবং 'মানসী' কাব্যের 'বোধ' কবিতা দুটি শেলি ও ওয়ার্ডসওয়ার্থের লেখার সাথে মিলে যায়। প্রিয়রঞ্জন ও নারায়ণ বিশ্বাসের মতে, 'গোরা' ও 'ঘরে বাইরে' উপন্যাস দুটিও ইংরেজি লেখকদের লেখার কপি-পেস্ট বলে বিভিন্ন সময়েই সমালোচনা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, মুসলিম কবি শেখ সাদী, মির্জা গালিব, ওমর খৈয়াম এবং বিদেশী পার্সিয়ান কবি জালালুদ্দিন রুমির 'ভারততীর্থ' কবিতাটি হুবহু নকল করা হয়েছে বলেও, সূত্রে উঠে এসেছে।
এমনকি, সমালোচনা রয়েছে, কাজী নজরুল ইসলামের শেষ বয়সে কথা বলতে না পারার সুযোগ নিয়ে তাঁর এবং লোকসাহিত্যের বহু সৃষ্টি রবীন্দ্রনাথ তাঁর বোনকে দিয়ে চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা' গানটির সুর শিলাইদহের বাউল গগন হরকরার 'আমি কোথায় পাবো তারে' গান থেকে চুরি করা হয়েছে বলেও, বিশেষজ্ঞ মত রয়েছে।
এছাড়া 'যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক' গানটির সুরও গগন হরকরার 'ওমন আশার মায়ায় ভুলে রবে' গান থেকে নেয়া হয়েছে।
জমিদারি শোষণ ও প্রজা নির্যাতন
জমিদার হিসেবে রবীন্দ্রনাথের প্রজা প্রীতি ও মানবতাবাদী রূপের আড়ালে ছিল এক নির্মম শোষকের চেহারা। ড. আহমদ শরীফের দৈনিক বাংলাবাজারে বৃহস্পতিবার (১ মে ১৯৯৭) প্রকাশিত এক প্রতিবেদন এবং অরবিন্দ পোদ্দারের মতে, ঠাকুর পরিবার প্রজাদের ওপর চরম অত্যাচার চালাত। গ্রামে আগুন দেয়া, বুট পরে প্রজাকে লাথি মারা ও পায়ে দলানোর মতো ঘটনা ঘটেছিল, যা হরিনাথ মজুমদার 'গ্রাম্য বার্তা প্রকাশিকা'য় তুলে ধরেছিলেন।
অতিরিক্ত খাজনা বৃদ্ধি ও জোরজুলুমের বিরুদ্ধে ইসমাইল মোল্লার নেতৃত্বে শিলাইদহে ঐতিহাসিক প্রজা বিদ্রোহ ঘটেছিল। ঠাকুর পরিবারের প্রতি কটাক্ষ করে কাঙাল হরিনাথ লিখেছিলেন, ধর্মমন্দিরে ধর্ম আলোচনা আর বাইরে এসে মনুষ্যশরীরে পাদুকাপ্রহার, এ কথা আর গোপন করতে পারি না।
শচীন্দ্র অধিকারীর 'শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ' গ্রন্থেও খাজনা আদায়ের অমানবিক চিত্র রয়েছে। যতিন সরকারের 'পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু দর্শন' গ্রন্থে বলা হয়েছে, কাছারি বাড়িতে হিন্দু প্রজাদের জন্য পাটি পেতে দেয়া হলেও মুসলিম প্রজাদের বসানো হতো মাটিতে।
সরকার শাহাবুদ্দীন আহমেদের 'ইতিহাসের নিরীখে রবীন্দ্র-নজরুল চরিত্রের ২৭৫ পৃষ্ঠা অনুযায়ী, পদ্মার চরের মুসলমান প্রজাদের কাবু করার জন্য নমশূদ্র প্রজা এনে বসতি স্থাপনের বুদ্ধি রবীন্দ্রনাথের ছিল। পুত্র রথীন্দ্রনাথের কৃষি খামারের প্রয়োজনে গরীব মুসলমান চাষীর ভিটেমাটি দখল করে জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল।
রাশিয়া গিয়ে টলস্টয়ের জমিদারি ত্যাগের কথা জেনে লজ্জিত হলেও অমিয় চক্রবর্তীকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, আমার ছেলে রথীন্দ্রনাথ খাবে কি?
প্রজা কল্যাণের কথা বলে রবীন্দ্রনাথ ৬ হাজার টাকা মূলধন ও নোবেল পুরস্কারের প্রাপ্ত ৭৫ হাজার টাকা এবং বন্ধুদের কাছ থেকে ৭% সুদে মূলধন সংগ্রহ করে কৃষকদের ১২% সুদে ঋণ দিয়ে ২৫ বছর ধরে লাভজনক মহাজনি কারবার চালিয়েছিলেন।
পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক মুক্তি রোধ করতে রবীন্দ্রনাথ কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের সাথে নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র করেছিলেন বলেও উঠে আসে নানা সূত্রে।
বঙ্গভঙ্গ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধিতা
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলার অবহেলিত মুসলমান ও নিচুবর্ণের হিন্দুরা লাভবান হওয়ার সুযোগ পেলেও কলকাতাকেন্দ্রিক আধিপত্য হারানোর ভয়ে হিন্দু জমিদাররা সহিংস আন্দোলন শুরু করে। রবীন্দ্রনাথ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নেতৃত্বে চলা এই আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশরা ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়, যার ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ কমপক্ষে ১০০ বছর পিছিয়ে যায় বলে মনে করে বিশেষজ্ঞরা। কট্টর হিন্দুত্ববাদী হিসেবে পরিচিত ক্ষুদিরামকে এই আন্দোলনে ব্যবহার করা হয়েছিল।
তৎকালীন এই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে রচিত হয় 'আমার সোনার বাংলা'। অখণ্ড বাংলার সমর্থনে লেখা হলেও পূর্ব বাংলার একাংশের মতে, গানটি তৎকালীন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর স্বার্থের বিপক্ষে ছিল বলে মনে করে বিশ্লেষকরা। ফলে গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্থান পাওয়া নিয়ে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বৈচিত্র্যময় মতভেদ দেখা যায়। তবে, দেশের মানুষের একটা বড় অংশের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এই গানের।
বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ ১৯১২) কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে এক বিশাল সভার সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আশুতোষ মুখার্জী ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নেতৃত্বে লর্ড হার্ডিংসকে ১৮ বার স্মারকলিপি দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ঠেকানোর চেষ্টা করা হয় বলে সমালোচনা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথসহ কয়েকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিদ্রুপ করে 'মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়' বলে ডাকতেন, যার প্রমাণ ইতিহাসবিদ সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাসের বক্তব্যেও স্পষ্ট।
জয়া চ্যাটার্জীর ‘বাংলা ভাগ হলো’ বইতে ৩১ ও ৩২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, লর্ড জেটল্যান্ডের কাছে পাঠানো স্মারকলিপিতে বাংলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতা যেন তাদের হাতে না যায়, সেজন্য দাবি করা হয় যে বাঙালি হিন্দুরা সংখ্যায় কম হলেও সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে শ্রেষ্ঠ, তাই তাদের প্রতিনিধিত্ব বেশি দিতে হবে।
এই স্মারকলিপিতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, পি. সি. রায় এবং ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী স্বাক্ষর করেছিলেন।
সাম্প্রদায়িক চিন্তা ও অন্যান্য অভিযোগ
রাজনৈতিক ভূমিকার পাশাপাশি নোবেলজয়ী এই সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনায়ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতার ছাপ পাওয়া যায়।
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার বহু আগে থেকেই উপমহাদেশের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তা নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে বড় ধরনের তর্ক-বিতর্ক চলছিলো। ভারতের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে নাকি দেবনগরী লিপির হিন্দি হবে, তা নিয়ে কংগ্রেস ও রাজনৈতিক মহল বেশ সরব ছিল।
সে সময় মুসলিম প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বাংলা এবং উর্দু—উভয় ভাষাকেই ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কারণ তাদের মতে, ভাষার দিক থেকে বাংলা ভাষা হিন্দি থেকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ।
প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের রচিত ‘রবীন্দ্র বর্ষপঞ্জী’ কলকাতা, ১৯৬৮ এর ৭৮ পৃষ্ঠার তথ্য অনুযায়ী, ১৯১৮ সালে মহাত্মা গান্ধী যখন ভারতের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত জানতে চেয়ে পত্র পাঠান, তখন রবীন্দ্রনাথ তার জবাবে স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন,“The only possible language for inter-provincial intercourse is Hindi in India” যার অর্থ দাঁড়ায়, হিন্দি ছাড়া ভারতে আন্তঃপ্রাদেশিক সাধারণ ভাষা হওয়ার যোগ্য অন্য কোনো ভাষাই নেই।
আবুল কালাম শামসুদ্দিনের ‘অতীত দিনের স্মৃতি’বইয়ের ১৫০ পৃষ্ঠা তথ্য অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ভারতের মুসলমানরা ধর্মে ইসলাম অনুরাগী হলেও জাতিতে তারা হিন্দু।
এমনকি ইরান সফরে গিয়ে যখন রবীন্দ্রনাথ দাবি করেন, “ভারতের মুসলমানেরা তো আপনাদেরই বংশোদ্ভূত”, তখন ইরানের বিখ্যাত প্রাজ্ঞ দার্শনিক জালালুদ্দিন তেহরানী তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, “ভারতের মুসলমানেরা ভারতেরই মানুষ, ভারত তাদের দেশ এবং হিন্দুরা তাদের প্রতিবেশী।”
ভারতের শাসক দল বিজেপির নেতাদের প্রায়ই দাবি করতে দেখা যায়, সে দেশের সকল মুসলমান মূলত হিন্দু এবং তাদের ‘ঘর ওয়াপসি’ বা স্বধর্মে ফেরা উচিত। তবে এ ধারণার কথা অনেক আগেই প্রকাশ করেছিলেন বিশ্বকবিখ্যাত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
শুধু বক্তব্যেই নয়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন রচনা ও সাহিত্যেও ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে নানা সময়ে।
রবীন্দ্রনাথের বীরগুরু প্রবন্ধে ইসলাম ধর্মকে চরমভাবে কটাক্ষ করা হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম এবং গোবিন্দকে তুলনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করিবার সময় মোহাম্মদ নিজের নাম উচ্চারণ করিতে আদেশ করিয়া গিয়েছেন। অথচ গোবিন্দর প্রশংসা করে লিখেছেন, গোবিন্দ ধর্মপ্রচার পুণ্যের জন্য বিস্তার ও পাপের বিনাশ সাধনের জন্য আসিয়াছেন। অন্যান্য মানুষ যেমন তিনিও তেমনি একজন মানুষ। তিনি পিতা পরমেশ্বরের দাস। এই পরমাশ্চর্য জগতের একজন দর্শক মাত্র। তাকে ঈশ্বর বলিয়া যে পূজা করিবে নরকে তাহার গতি হইবে। অথচ, জানা যায় মুসলিমদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কোথাও নিজেকে পূজা কিংবা সেজদা করার কথা বলেননি। বরং সেজদা করতে বলেছেন, একমাত্র মহান আল্লাহর প্রতি। তারপরেও রবীন্দ্রনাথ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চরমভাবে অপমান করে কথা বলেছেন বলে মনে করেন ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা।
ইসলামি গবেষকদের মতে, ইসলামে সেজদা ও ইবাদত একমাত্র মহান আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত এবং মহানবী (সা.) কখনোই নিজেকে পূজা করতে বলেননি। ফলে প্রবন্ধে বর্ণিত বক্তব্যটি ইসলামের মূল বিশ্বাসের পরিপন্থী এবং মহানবী (সা.)-এর মর্যাদাহানিকর বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের রীতির মতো নভেল'-এ মুসলমানদের 'যবন' বা (বর্বর) ও 'ম্লেচ্ছ' বলে গালি দেয়া হয়েছে এবং আল্লাহর নাম বিকৃত করা হয়েছে, অন্যদিকে হিন্দুদের 'আর্য যোদ্ধা' বলা হয়েছে।
'প্রায়শ্চিত্ত' নাটকে লেখা হয়, যে মুসলমান আমাদের ধর্ম নষ্ট করছে, তাদের যারা মিত্র তাদের বিনাশ না করাই অধর্ম।
এমনকি, অন্য ধধর্মাবলম্বীদের হুমকি দিয়ে ‘কলকাতায় এক বাসায়’ এক কবিতায় লেখা হয়, ওগো শোনো ভাই বিশু, পথে শুনি জয় যিশু... হাতে তুলে লও লাঠি, হিন্দুধর্ম করিব রক্ষা, খৃষ্টানি হবে মাটি।
পারিবারিক এই ধারা বজায় রেখে রবীন্দ্রনাথের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথও সতীদাহ প্রথাকে সমর্থন করে 'যবন' গালি দিয়ে লিখেছিলেন, "জ্বল জ্বল চিতা!... শোনরে যবন, শোনরে তোরা যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবে..."
পরবর্তী সময়ে, শান্তিনিকেতনে মোতাহার হোসেন চৌধুরী, বিশ্বনবী ও ইসলাম সম্পর্কে প্রশংসা না লেখার কারণ জিজ্ঞেস করলে রবীন্দ্রনাথ উত্তর দেন, তিনি কোরআন বেশিদূর পড়তে পারেননি এবং রাসূলের জীবনচরিত তাঁর ভালো লাগেনি।
এছাড়া, বেদ ব্রাহ্মণ রাজা ছাড়া আর কিছু নাই ভবে পূজা করিবার, এই কয়টি কথা যেন মনের সার ভুলিনি আমি কথা হব, অর্থাৎ পৃথিবীর একমাত্র হিন্দু ধর্মই সঠিক ধর্ম তাদের ব্রাহ্মণ রাজাই একমাত্র পূজার যোগ্য বলে রবীন্দ্রনাথ ফুটিয়ে তুলেছে তার লেখায়।
আর নিজেকে হিন্দুত্ববাদী কবি হিসাবে দাবি করে রবীন্দ্রনাথ আরও বলেছিলেন, মুসলমান বিদ্বেষী হলেও, জাতীয় সাহিত্য বিসর্জন দিতে পারি না, মুসলমানদের উচিত নিজেদের সাহিত্য নিজেরাই সৃষ্টি করা।
ইংরেজদের ২’শ বছরের ইতিহাসে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে মুসলমানরা প্রতিটি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে, মুসলমানেরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করায় সমালোচনা করেন ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ তার কণ্ঠরোধে লিখেছেন, কিছুদিন হইল একদল ইতর শ্রেণীর অবিবেচক মুসলমান কলকাতার রাজপথে লোস্টন হস্তে অভদ্রতার চেষ্টা করিয়াছিল। তাহার মধ্যে বিশ্বের ব্যাপার এই যে উপদ্রবের লক্ষ্যটা বিশেষ করে ইংরেজদের প্রতি। তাদের শাস্তিও যথেষ্টই হইয়া ছিল। প্রবাদ আছে ইটটি মারিলে পাটকেলটিও খাইতে হয।
ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও রবীন্দ্রনাথের অবস্থান ছিল বিতর্কিত। আন্তর্জাতিক ও ঐতিহাসিক দলিলে রবীন্দ্রনাথের জায়নবাদী ও ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থক হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
১৯৪১ সালের ১৪ই আগস্ট প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র 'The Sentinel' রের ৩০ পৃষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর সংবাদের শিরোনাম ছিল, "Tagore, Friend of Jews, Zionism, Dies In India" যার বাংলা অর্থ, ইহুদি ও জায়নবাদের বন্ধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভারতে প্রয়াণ। আর এই প্রতিবেদনে বলা হয়, রবীন্দ্রনাথ নাৎসি বাহিনীর ইহুদি নির্যাতনের প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি জায়নবাদের উদ্দেশ্য ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন।
একইসাথে তিনি তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন, ইহুদি জাতীয়তাবাদকে দেখছি তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সমৃদ্ধ করার এক প্রচেষ্টা হিসেবে। আমি এমন এক ফিলিস্তিন কল্পনা করি, যেখানে আরবরা তাদের নিজস্ব ধর্মীয় জীবনযাপন করবে, আর ইহুদিরা আবারও তাদের গৌরবময় ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। এখানে ইহুদিদের গুরত্ব বেশি দেয়া হয়েছে।
সমালোচনা রয়েছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তাঁর পরিবালর, ব্রিটিশ দের পাশাপাশি হিন্দুত্ববাদী স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছিলেন। তাঁর জমিদারি শোষণ, প্রজা নির্যাতন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা, সাহিত্য চুরি এবং জায়নবাদ ও ইসরায়েল প্রীতির ইতিহাস আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তবে, সবমিলিয়ে সাহিত্যে অগাধ বিচরণের প্রসঙ্গে টেনে রবীন্দ্রনাথকে মর্যাদার আসনে রেখেছে বহু মানুষ। বিতর্ক একপাশে সরিয়ে তারা সৃষ্টিশীল রবীন্দ্রনাথের বর ভক্ত।
আরও পড়ুন:







