সরকারবিরোধী চক্রান্ত, সহিংসতায় উসকানি, অবৈধ অর্থায়ন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগে পল্লবী থানার মামলায় অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তা কাজী গুলশান আরা (৪৩) ও বিজয় দেবাশীষ নারায়ন পালকে চার দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের পরিদর্শক শেখ বশির আহমেদ রিমান্ড শেষে আসামিদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, আসামিদের অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। রিমান্ডে তাঁদের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তাঁদের কথিত ষড়যন্ত্র চিহ্নিত করতে পরবর্তী সময়ে আরও রিমান্ডের আবেদন করা হবে। অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পরবর্তী রিমান্ড আবেদন পর্যন্ত তাঁদের কারাগারে রাখা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জামিনের বিরোধিতা রাষ্ট্রপক্ষের
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাওসার আহমেদ আসামিদের জামিনের বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. আতাউর রহমান খান রুকু ও মো. মশিউর রহমান জামিনের পক্ষে শুনানি করেন। শুনানি শেষে আদালত জামিনের আবেদন নাকচ করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. আতাউর রহমান খান রুকু বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এর আগে গত সোমবার তাঁদের চার দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তার সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলমের আদালত এ আদেশ দেন।
যেভাবে গ্রেপ্তার হন দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা
গত রবিবার (১১ অক্টোবর) রাতে পল্লবী জোনাল টিমের একটি দল অভিযান চালিয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে নিজ বাসা থেকে লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাত আড়াইটার দিকে বনানীর বাসা থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দেবাশীষকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার অভিযোগে যেসব কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, কাজী গুলশান আরার পল্লবীর বাসায় অবস্থান করে দুই আসামি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টার্স আলফা ১ এবং বিবিএম ট্রান্সপারেন্সি নামের প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা সরকারবিরোধী হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ইউনিটি কেয়ার অ্যান্ড পাবলিক পার্লামেন্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
মামলার এজাহারে আরও বলা হয়, আজকাল ডটকম নামে একটি পেজ তৈরি করে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতায় উসকানি দেওয়ার মতো কনটেন্ট প্রচার করা হতো। পাশাপাশি কাজী গুলশান আরার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম প্রচার ও পরিচালনার অভিযোগও আনা হয়েছে।
এজাহারে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি প্রকাশ্যে আনুগত্য প্রকাশ করেন কাজী গুলশান আরা। পরে সহযোগীদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ নামে একটি কমিটি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানো, দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টকশোতে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অবজ্ঞা ছড়ানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আসামিরা সহযোগীদের নিয়ে সরকার ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং কুৎসামূলক প্রচার চালিয়ে আসছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি গুপ্তচরের যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এসব ঘটনায় পল্লবী থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. আলী আকবার দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় মামলাটি করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:







