বৃহস্পতিবার

১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ৩০ আশ্বিন, ১৪৩৩

মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার কর্মী নিয়োগে সম্মতি, তালিকায় ৩৩৮ এজেন্সি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:২৬

শেয়ার

মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার কর্মী নিয়োগে সম্মতি, তালিকায় ৩৩৮ এজেন্সি
ছবি সংগৃহীত

মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মতি দিয়েছে মালয়েশিয়া। তালিকাভুক্ত এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ, ভিসা প্রক্রিয়াকরণ ও বিএমইটি ছাড়পত্রের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী কর্মীরা তালিকাভুক্ত ও অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করতে পারবেন অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টার।

মন্ত্রণালয় জানায়, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে কাজ করছেন এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা এবং স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও অংশগ্রহণমূলক নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

আগের প্রক্রিয়ায় ৪২৩ এজেন্সির তালিকা পাঠানো হয়

২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন ও তালিকাভুক্ত করার বিধান রয়েছে। দেশটি যেসব উৎস থেকে কর্মী নিয়োগ করে, সেসব দেশের ক্ষেত্রেও নিজস্ব নীতিমালা ও যোগ্যতার শর্ত অনুসরণ করা হয়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মালয়েশিয়ার নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আলোচনার একপর্যায়ে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু শর্তে নমনীয়তা দেখায় মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। কারণ, প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত কয়েকটি শর্ত বাংলাদেশের অনেক এজেন্সির পক্ষে পূরণ করা কঠিন ছিল।

এর ধারাবাহিকতায় প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র ও সহায়ক দলিলসহ ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

৩৩৮টি এজেন্সিকে নিয়োগ কার্যক্রমে যুক্ত করার সুযোগ

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ ও সীমিত হয়ে যাওয়া বৈদেশিক শ্রমবাজার পুনরায় চালু ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর প্রথম সরকারি বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে মালয়েশিয়ার আইন, নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড ও বিদ্যমান সমঝোতা মেনে যত বেশি সম্ভব বৈধ ও যোগ্য বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে কর্মীদের স্বার্থ ও অভিবাসন ব্যয় সুরক্ষিত রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল), ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। সব মিলিয়ে তালিকাভুক্ত এজেন্সির সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৩৩৮টি।

এসব এজেন্সি নিজেদের উদ্যোগে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা খুঁজে বের করতে এবং চাকরির চাহিদাপত্র বা জব অর্ডার সংগ্রহ করতে পারবে। পাশাপাশি বাংলাদেশে কর্মী নির্বাচন ও প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ।

যেভাবে পরিচালিত হবে নিয়োগপ্রক্রিয়া

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়া বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের উদ্যোগে দেশটির শ্রমবাজার থেকে জব অর্ডার বা কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র সংগ্রহ করবে।

দ্বিতীয় ধাপে সংশ্লিষ্ট এজেন্সি বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করে কর্মী নির্বাচন এবং নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কর্মী সংগ্রহ ও নির্বাচনের দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির নিজের ওপর।

তৃতীয় ধাপে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কলিং ভিসা, ই-ভিসা এবং অন্যান্য নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ার প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে বোয়েসেলসহ তালিকাভুক্ত ২৫টি প্রসেসিং ও সার্ভিস এজেন্সি প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।

মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম শেষ করবে। অনুমোদিত প্রতিটি এজেন্সি নিজেদের রিক্রুটিং লাইসেন্সের অধীনে কর্মীদের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিতে পারবে।

বোয়েসেল ও অপর ২৫টি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে। বিএমইটির ছাড়পত্রের জন্য অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনাপত্তিপত্র দিতে পারবে তারা। এতে প্রতিটি এজেন্সির নিজস্ব দায়িত্ব, জবাবদিহি ও ব্যবসায়িক স্বাধীনতা বজায় থাকবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো ঠেকানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। কর্মীরা যাতে সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতে চায় সরকার।

রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে দেশের আইন মেনে নতুন জব অর্ডার সংগ্রহ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে নিয়োগ কার্যক্রমে কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ

মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ এখনো চলছে। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, এ তালিকা চূড়ান্ত করার দায়িত্ব বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের যৌথ।

শ্রমবাজার দ্রুত চালুর স্বার্থে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান মেডিক্যাল সেন্টারগুলো পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে সরেজমিনে প্রতিটি মেডিক্যাল সেন্টার পরিদর্শনের পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। এ কারণে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, মালয়েশিয়া সরকারের অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকা থেকে বাংলাদেশের অনুরোধে ফ্যাসিবাদ ও অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত মেডিক্যাল সেন্টারগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব কেন্দ্র মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

শ্রমবাজার চালুর পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে নতুন নীতিমালার আলোকে মেডিক্যাল সেন্টারগুলো যাচাই-বাছাই করবে। এরপর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শুরু হবে।

মন্ত্রণালয় জানায়, তালিকাভুক্ত মেডিক্যাল সেন্টারগুলো বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত যাচাই-বাছাই করে এবং এসব প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করা হবে। পুরো প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে সরকার।

নতুন মেডিক্যাল সেন্টার অনুমোদন পেলে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে তালিকা প্রকাশ করা হবে। মন্ত্রণালয়ও সবার জন্য সেই তালিকা ঘোষণা করবে। এ বিষয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।

অনুমোদিত এজেন্সি ও মেডিক্যাল সেন্টার ব্যবহারের নির্দেশনা

মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী কর্মীদের তালিকাভুক্ত ও অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্যও অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টার ব্যবহার করতে হবে।

কোনো নির্দিষ্ট মেডিক্যাল সেন্টারকে এককভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। কর্মীরা যাতে সহজে ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, কোনো ধরনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পান, সে লক্ষ্যেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগে দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা এবং ইতিবাচক মনোভাবের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই সুযোগ সফল করতে সরকার, রিক্রুটিং এজেন্সি ও কর্মীদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, সুশৃঙ্খল ও টেকসই শ্রমবাজার গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।