বৃহস্পতিবার

১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ৩০ আশ্বিন, ১৪৩৩

সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্যের ঘাটতি, ১৩১ সাইটে ৮ হাজার ভাঙা লিংক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৪২

শেয়ার

সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্যের ঘাটতি, ১৩১ সাইটে ৮ হাজার ভাঙা লিংক
ছবি সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে বঙ্গভবনের ইতিহাসবিষয়ক পাতায় প্রবেশ করলে দেখা যায়, অনুরোধ করা পৃষ্ঠাটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইটেও প্রধানমন্ত্রীর জীবনবৃত্তান্ত, জাতির উদ্দেশে ভাষণ ও অন্যান্য ভাষণের জন্য নির্ধারিত পাতাগুলো ফাঁকা। ফটো গ্যালারিতে রয়েছে শুধু গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের ছবি। অথচ ওয়েবসাইটে সর্বশেষ হালনাগাদের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৪ অক্টোবর ২০২৬।

রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটের এই চিত্র সরকারি অন্যান্য দপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। সরকারি ওয়েবসাইটে অসম্পূর্ণতা, কারিগরি ত্রুটি, পুরোনো তথ্য ও অকেজো লিংকের সমস্যা দীর্ঘদিনের। কোনো কোনো দপ্তরে নতুন খবর ও নোটিশ প্রকাশ করা হলেও স্থায়ী তথ্যের পাতাগুলো বছরের পর বছর অপরিবর্তিত থাকছে।

সরকারি ওয়েবসাইটে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ইতিহাস, সেবা, কর্মকর্তাদের পরিচিতি, নীতিমালা, বার্ষিক প্রতিবেদন, প্রজ্ঞাপন ও যোগাযোগের তথ্য সহজে পাওয়ার কথা। এসব তথ্য যুক্ত করা ও নিয়মিত হালনাগাদের নির্দেশনা থাকলেও অনেক দপ্তর তা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। ফলে ওয়েবসাইটে সর্বশেষ হালনাগাদের তারিখ থাকলেও সব তথ্য হালনাগাদ কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। কোথাও বিপুল তথ্য জমা থাকলেও তা অগোছালো, অপ্রয়োজনীয় কিংবা ব্যবহার অনুপযোগী।

নির্দেশিকা থাকলেও মিলছে না প্রয়োজনীয় তথ্য

সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইট পরিচালনার বিষয়ে নীতিমালার পরিবর্তে নির্দেশিকা রয়েছে। গত ২৫ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইট নির্দেশিকা-২০২৬ জারি করে।

নির্দেশিকায় দপ্তরের পরিচিতি, ইতিহাস, কার্যাবলি, সেবা, নীতিমালা, আইন, বিধি, প্রকাশনা, বার্ষিক প্রতিবেদন, চলমান ও সমাপ্ত প্রকল্প, বাজেট এবং ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য ওয়েবসাইটে রাখার কথা বলা হয়েছে। কর্মকর্তাদের নাম, পদ ও পদবি, পরিচিতি নম্বর, শাখার নাম, মোবাইল নম্বর ও টেলিফোন নম্বর যুক্ত করার নির্দেশনাও রয়েছে। পুরোনো তথ্যের আর্কাইভ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ তথ্য ও নথি মূল পাতা থেকে সরিয়ে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। তবে খুব কম ওয়েবসাইটেই সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ই-পার্টিসিপেশন পাতাটি ফাঁকা পড়ে আছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে চলমান ও সমাপ্ত প্রকল্পের লিংকে প্রবেশ করা যায় না। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক ওয়েবসাইটে চলমান প্রকল্পের পাতায় প্রবেশ করা গেলেও সেখানে কোনো তথ্য নেই। মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দপ্তরগুলোর যোগাযোগের পাতাটিও তথ্যশূন্য।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সমাপ্ত প্রকল্পের তথ্য থাকলেও চলমান প্রকল্পের পাতা ফাঁকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে চলমান প্রকল্পের পাতায় যুক্ত করা হয়েছে সমাপ্ত প্রকল্পের তথ্য। বেশির ভাগ দপ্তরের ওয়েবসাইটে হালনাগাদ বার্ষিক প্রতিবেদন নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ওয়েবসাইটেও ২০২৩ সালের পর কোনো বার্ষিক প্রতিবেদন যুক্ত করা হয়নি।

সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইট তৈরির কাজ করে সরকারের আইসিটি বিভাগ ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে ইউএনডিপির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত প্রোগ্রাম এসপায়ার টু ইনোভেট বা এটুআই।

এটুআইয়ের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন বলেন, এটুআইয়ের মূল কাজ ছিল ওয়েবসাইট তৈরি করা। নিয়মিত তথ্য হালনাগাদের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের। এ বিষয়ে তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো কোনো ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জনবল বা কারিগরি সক্ষমতা না থাকলে তথ্য হালনাগাদে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

১৩১ সরকারি ওয়েবসাইটে ৮ হাজার ৬১০টি ভাঙা লিংক

সরকারি তথ্য ও সেবা পেতে ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় লিংক কাজ করছে না। ডকেট বিডি নামের একটি প্ল্যাটফর্ম দেশের ১৩১টি সরকারি ওয়েবসাইট নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে। প্ল্যাটফর্মটির তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্ট থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব ওয়েবসাইটে ৮ হাজার ৬১০টি ভাঙা লিংক শনাক্ত করা হয়েছে। ওয়েবসাইটগুলো ৬৭টি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সংস্থার অধীনে পরিচালিত হয়।

ডকেট বিডির বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ওয়েবসাইট মনিটর ব্যবস্থায় প্রতি সপ্তাহে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি ওয়েবসাইটগুলো পরীক্ষা করা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা রাজকুমারী বলেন, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি ওয়েবসাইটে কী কী সেবা রয়েছে এবং কোথায় সমস্যা আছে, তা শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এরপর ওয়েবসাইটগুলোতে পরিবর্তন হয়ে থাকতে পারে।

বিপুল তথ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি খুঁজে পাওয়া কঠিন

সরকারি অনেক ওয়েবসাইটে বিপুলসংখ্যক নোটিশ ও নথি রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়ার ব্যবস্থা সহজ নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে নোটিশের সংখ্যা ১২ লাখ ৪৮ হাজার ৯১৭। এত বিপুল তথ্যের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় নথি দ্রুত খুঁজে পেতে কার্যকর অনুসন্ধান ও শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা দরকার। কোন নথি কার্যকর, কোনটি সংশোধিত এবং কোনটি বাতিল, তা-ও স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়েবসাইট হালনাগাদ করার অর্থ শুধু নতুন খবর বা নোটিশ প্রকাশ করা নয়। কর্মকর্তাদের নাম ও যোগাযোগের তথ্য, সেবা, নীতিমালা, ফরম, প্রকল্পের তথ্য, পুরোনো নথি এবং বিভিন্ন লিংকও নিয়মিত যাচাই করতে হবে। চাকরির আবেদন, সরকারি সেবা, নীতিমালা, প্রজ্ঞাপন, অনুমোদন, অভিযোগ ও যোগাযোগের তথ্যের জন্য অনেক মানুষ এখন সরকারি ওয়েবসাইটের ওপর নির্ভর করেন।

নির্দিষ্ট নীতিমালা ও দায়িত্ব নির্ধারণের পরামর্শ

ডিজিটাল ডেমোক্রেসিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এ এইচ এম বজলুর রহমান বলেন, সরকারি ওয়েবসাইট সচল, হালনাগাদ, সহজে অনুসন্ধানযোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস হওয়া উচিত। কিন্তু দেশে সরকারি সাইটগুলোতে অনেক সময় প্রয়োজনীয় ও হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায় না। এ জন্য ওয়েবসাইট হালনাগাদের নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। কত দিন পরপর তথ্য হালনাগাদ করতে হবে, তা-ও নির্দিষ্ট করা দরকার।

প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরে ওয়েবসাইট পরিচালনা এবং তথ্য হালনাগাদের জন্য জনবল রয়েছে উল্লেখ করে বজলুর রহমান বলেন, কার দায়িত্ব কী এবং কোন তথ্য কত দিনের মধ্যে হালনাগাদ করতে হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় ব্যবস্থাপনা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হচ্ছে। সরকারি ওয়েবসাইট হালনাগাদ রাখা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রতি মাসে মন্ত্রণালয় বা দপ্তরভিত্তিক সমন্বয় সভার আলোচ্যসূচিতে বিষয়টি রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ওয়েবসাইট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অনেকে এখন পলাতক। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রকৌশলী থাকলেও তাঁদের দায়িত্ব মূলত ইন্টারনেট ও আইটি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

এটুআইয়ের হয়ে কাজ করা ভেন্ডরদের কাছ থেকে ওয়েবসাইট বুঝে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পাসওয়ার্ড হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। ফলে অনেক ওয়েবসাইটের রক্ষণাবেক্ষণ নামমাত্র হচ্ছে।

তানভীর হাসান জোহার ভাষ্য, দপ্তরগুলো অনেক সময় মনে করে, ওয়েবসাইট হালনাগাদের দায়িত্ব এটুআইয়ের, তাদের নয়। দায়িত্ব এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের দিকে ঠেলে দেওয়ার কারণেও ওয়েবসাইটগুলো কার্যত অবহেলিত থেকে যাচ্ছে।