সোমবার

১২ অক্টোবর, ২০২৬ ২৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে প্রশিক্ষণ-পরামর্শেই খরচ ৮৪৭ কোটি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:১২

শেয়ার

তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে প্রশিক্ষণ-পরামর্শেই খরচ ৮৪৭ কোটি
ছবি সংগৃহীত

প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার স্বাস্থ্য প্রকল্পে পরামর্শক, প্রশিক্ষণ ও সেমিনার খাতে ৮৪৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। এ ছাড়া ভবন ও অবকাঠামো, ভ্রমণ এবং গাড়িভাড়া খাতেও অস্বাভাবিক ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব খরচের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ব্যয় কমানোর সুপারিশ করেছে কমিশন। প্রস্তাবিত ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে প্রকল্প প্রস্তাবটি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

স্ট্রেংদেনিং হেলথ ইমার্জেন্সি প্রিভেনশন, প্রিপার্ডনেস, রেসপন্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স উইথ হেলথ অ্যাপ্রোচ শীর্ষক প্রকল্পে এসব ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ প্রকল্পটির ব্যয় প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, প্রস্তাবের ধরন দেখে তাঁর মনে হয়েছে, এতে দুর্নীতির আয়োজন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মামুন-আল-রশীদের মতে, দেশে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল এবং চিকিৎসকের অভাব নেই। তাই এত বেশি পরামর্শকের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্পের প্রতিটি খাতের ব্যয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সাবেক এই আমলা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সম্ভবত প্রথমে মোট খরচ নির্ধারণ করেছে, পরে ইউনিটভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণের চেষ্টা করেছে। এটি সঠিক পদ্ধতি নয়। এতে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমে ইউনিটভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণ করে পরে মোট ব্যয় হিসাব করা উচিত।

গত ৭ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উন্নয়ন প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয় নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রকল্প বাস্তবায়নে পরামর্শক খরচ কমানোর নির্দেশ দিয়ে নিজস্ব দক্ষ জনবলকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রকল্পে সরকারি অর্থ ২৪৭ কোটি, বৈদেশিক ঋণ ২৭৪৫ কোটি

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯৯২ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ২৪৭ কোটি ৯২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্পটির লক্ষ্য একটি সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানো। একনেকের বৈঠকে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

প্রস্তাবিত ব্যয় পর্যালোচনায় গত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিভিন্ন খাতের বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা।

সভা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পে পরামর্শক খাতে ৩২২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের ১১ শতাংশ। দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য চাওয়া হয়েছে ৩৯৭ কোটি ৫ লাখ টাকা বা মোট ব্যয়ের ১৩ শতাংশ। সেমিনার ও কর্মশালা খাতে প্রস্তাবিত বরাদ্দ ১২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৪ দশমিক ২ শতাংশ।

এ ছাড়া অন্যান্য ভবন ও অবকাঠামো খাতে ৩০৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা বা মোট ব্যয়ের ১০ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ভ্রমণ খাতে ১২০ কোটি টাকা এবং গাড়িভাড়া বাবদ ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাবও রয়েছে।

এসব খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ বাস্তবায়নে কী ধরনের সুফল পাওয়া যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। পিইসি সভায় বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত ব্যয়ের মাধ্যমে কী ধরনের দৃশ্যমান উপকার পাওয়া যাবে, তা প্রকল্প প্রস্তাবে স্পষ্ট করা হয়নি। এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যক্রমভিত্তিক নির্দেশকের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আগের ব্যাখ্যাতেও সন্তুষ্ট নয় পরিকল্পনা কমিশন

প্রকল্পটির বিভিন্ন বিষয় স্পষ্ট করার জন্য গত ১২ মে পরিকল্পনা কমিশন থেকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ জুলাই অতিরিক্ত ব্যয়ের যৌক্তিকতা তুলে ধরে ব্যাখ্যা দেয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। তবে সেই ব্যাখ্যাতেও সন্তুষ্ট হয়নি কমিশন।

পরামর্শক, প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালা, ভ্রমণ এবং অন্যান্য ভবন ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে অস্বাভাবিক ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে বলে মনে করছে কমিশন। এসব খাতে অতিরিক্ত ব্যয় কমিয়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মতো দৃশ্যমান কার্যক্রমে বরাদ্দ বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে পিইসি সভা।

পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের যুগ্ম প্রধান (স্বাস্থ্য) মানস মিত্র জানিয়েছেন, পিইসি সভায় প্রকল্পটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সভার কার্যবিবরণী তৈরির কাজ চলছে। এটি সম্পন্ন হলে প্রকল্প প্রস্তাবটি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ফেরত পাঠানো হবে।

প্রস্তাবে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান প্রস্তাবের মতো প্রকল্পটি আর থাকবে না। এতে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগও থাকবে না।

প্রকল্প প্রণয়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি টিআইবির

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রকল্প প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, প্রকল্পটিতে বিশ্বব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণ রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ঋণের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অনেক সময় বিশ্বব্যাংকও বিভিন্ন অনিয়মের সুযোগ করে দেয়। এ প্রকল্পে বাংলাদেশের আমলা ও বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা যোগসাজশের মাধ্যমে সুবিধা ভাগাভাগির চেষ্টা করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের দুর্নীতির কারণে জনগণের অর্থ অপচয় হয়। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

১০০ উপজেলা নির্বাচন ও সমীক্ষা প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন

পিইসি সভায় প্রকল্পটির আরও কয়েকটি বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির প্রভাব দেশব্যাপী হলেও এটি মূলত ১০০টি উপজেলায় বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব উপজেলা কীভাবে নির্বাচন করা হয়েছে এবং এলাকাভিত্তিক বরাদ্দ কীভাবে চূড়ান্ত করা হবে, তা স্পষ্ট করতে বলা হয়েছে।

প্রকল্পের সমীক্ষা প্রতিবেদন কোন সংস্থার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে, তা-ও পরিষ্কার নয় বলে উল্লেখ করেছে কমিশন। সমীক্ষায় পরিসংখ্যান অথবা তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকল্পের যথার্থতা তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া অতীতে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণে এ ধরনের প্রকল্প নিয়েছে কি না, সে তথ্য দিতে বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত জনবলের বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতির তথ্যও চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যানবাহন বা পরিবহনসেবা কেনার ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের জনবলবিষয়ক কমিটির সুপারিশ সংযোজন করা হয়নি বলে সভায় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিটি ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের পরামর্শ সাবেক বিশ্বব্যাংক অর্থনীতিবিদের

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, এ ধরনের প্রকল্পের প্রস্তাব এলে কেন বিদেশ সফর প্রয়োজন, কারা যাবেন এবং প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান কী কাজে লাগবে, সেসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে। প্রতিটি ব্যয়ের বিষয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত।

তিনি বলেন, সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়। এভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে একধরনের শাস্তি নিশ্চিত হবে। তাঁর মতে, বাংলাদেশে প্রকল্প প্রস্তাব দেওয়ার জন্য শাস্তির কোনো আইন নেই। তাই পরিকল্পনা কমিশনের কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়ার প্রবণতা কমে।