সোমবার

১২ অক্টোবর, ২০২৬ ২৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ায় জিম্মি, মুক্তিপণ আদায়ে নির্যাতন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:৩০

শেয়ার

ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ায় জিম্মি, মুক্তিপণ আদায়ে নির্যাতন
ছবি সংগৃহীত

ইতালিতে পাঠানো এবং মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আরিফুল ইসলামকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছে দাবি করা হয় ২০ লাখ টাকা। ভাইকে মুক্ত করতে জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে ১০ লাখ টাকা দেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার উজ্জ্বল হোসেন।

পরিবারের অভিযোগ, পরে আরিফুলের বাবা ইজাল উদ্দিনকেও অপহরণ করা হয়। তাঁকে মুক্ত করতে আরও ১০ লাখ টাকা দিতে হয়। জিম্মি অবস্থায় ছোট ভাই আরিফুলের আকুতি শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন উজ্জ্বল।

আরিফুলের পরিবারের এই অভিজ্ঞতা লিবিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের চিত্র তুলে ধরে। ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর অনেককে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্যাতনের ভিডিও স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে অর্থ আদায় করছে পাচারকারী চক্র। বিপুল টাকা দিয়েও অনেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। কেউ নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন, আবার কেউ ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারাচ্ছেন।

ইউরোপযাত্রায় খরচ ৬৭ লাখ টাকা পর্যন্ত

ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় বাংলাদেশিদের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ কেউ এ যাত্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা খরচ করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যয়ের পরিমাণ ৬৫ থেকে ৬৭ লাখ টাকায় পৌঁছাচ্ছে।

এত অর্থ ব্যয় করেও গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকছে না। বরং অনেকে যাত্রাপথে জিম্মি হচ্ছেন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন কিংবা সাগরে প্রাণ হারাচ্ছেন।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছেছেন ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি

ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথ ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে পৌঁছেছেন। ২০২৫ সালে এ পথে পৌঁছান ২০ হাজার ২৫৯ জন।

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে লিবিয়া থেকে ইতালিতে পৌঁছেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং গ্রিসে পৌঁছেছেন ৩ হাজার ৬০৮ জন।

এসব সংখ্যা ইউরোপে পৌঁছানো মানুষের হিসাব। যাত্রাপথে প্রাণ হারানো, নিখোঁজ হওয়া কিংবা দেশে ফিরে আসা মানুষের মোট সংখ্যা এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এই পথে যাত্রার ঝুঁকি স্পষ্ট হয়েছে ২০২৬ সালের দুটি ঘটনায়।

মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসের পথে একটি নৌযানে ছয় দিন খাবার ও পানি ছাড়া ভেসে থাকার পর অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। এরপর আগস্টে ৩৮ বাংলাদেশি ও চার সুদানি নাগরিককে নিয়ে লিবিয়া থেকে আরেকটি নৌযান যাত্রা করে। প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ওই ঘটনায় অন্তত ৯ বাংলাদেশি ও এক সুদানি নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। উদ্ধার হন ২৯ বাংলাদেশি।

এই দুটি ঘটনায় অন্তত ২৭ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও এ পথে বিভিন্ন সময়ে নিহত ও নিখোঁজ বাংলাদেশির পূর্ণাঙ্গ নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি।

তিন দফায় দেশে ফিরেছেন ৫১৬ জন

লিবিয়ায় আটকে পড়া ও বিপদে থাকা বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগও চলছে। ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট, ১ সেপ্টেম্বর ও ১৫ সেপ্টেম্বর তিন দফায় মোট ৫১৬ জন দেশে ফিরেছেন। গত ছয় বছরে লিবিয়া থেকে দেশে ফিরে আসা প্রায় ১৫ হাজার মানুষের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত এই সংখ্যা।

দেশে ফিরলেও অনেকের সামনে রয়েছে ঋণের বোঝা, বিক্রি করা জমি কিংবা হারানো সঞ্চয় ফিরে পাওয়ার অনিশ্চয়তা। নতুন করে জীবন শুরু করাও তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

ফেরত আসা অভিবাসীদের ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার

লিবিয়া থেকে ফিরে আসা অভিবাসীদের নিয়ে ব্র্যাকের এক গবেষণায় তাঁদের অভিজ্ঞতার চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ৯৩ শতাংশকে বিভিন্ন শিবিরে আটকে রাখা হয়েছিল। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন ৭৯ শতাংশ এবং ৬৯ শতাংশের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না।

তবে এসব পরিসংখ্যান গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি। লিবিয়া থেকে ফিরে আসা সব অভিবাসীর ক্ষেত্রে একই চিত্র প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।