পর্দার আড়ালে ক্ষমতার বলয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কথিত প্রভাব, নিয়োগ-পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য, পেনশন তহবিলের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ—একের পর এক বিতর্কে এখন আলোচনার কেন্দ্রে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের কার্যালয়।
আর এসব অভিযোগের সূত্র ধরেই সামনে আসছে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস বিভাগের দুই কর্মকর্তা—ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার (আর্মি) পে-১ জি এম মামুনুর রশিদ এবং স্থানীয় ও রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরের এসএএস সুপার মাহমুদুল হাসান মামুনের নাম। দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁদের প্রভাব, শতকোটি টাকার অবৈধ লেনদেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে তাঁদের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ—এমনকি সম্প্রতি চিকিৎসার নামে তাঁদের ভারত সফর ঘিরেও উঠেছে নানা প্রশ্ন।
ভারত সফর নিয়ে প্রশ্ন
জানা গেছে, বুধবার (৭ অক্টোবর) জারি করা অফিস আদেশ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করে ভারতে যান অডিট কার্যালয়ের এই দুই কর্মকর্তা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে এখানেই—ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আলোচিত এই দুই কর্মকর্তার একই সময়ে চিকিৎসার জন্য কেন শুধু ভারতেই যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিল?
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই সফরের আড়ালে ভারতে অবস্থানরত আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, শেখ ফজলে নূর তাপস ও ওবায়দুল কাদেরের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাদ্দাম এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের সঙ্গে সাক্ষাতের মহাপরিকল্পনা নিয়েই তাঁদের এই যাত্রা। সেই সাথে এই মহাপরিকল্পনার নেপথ্যের মূল হোতা হিসেবে উঠে আসে সিএজি নুরুল ইসলামের নাম।
মাহমুদুল হাসান মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
শুধু তাই নয় স্থানীয় ও রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান মামুনকে ঘিরে রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা অভিযোগ। স্থানীয় সরকার অডিটে কর্মরত অনেক কর্মকর্তার দাবি, রাজধানীর উত্তরখান এলাকায় প্রায় ১৫০টি অটোরিকশা ও গ্যারেজের মালিক তিনি। সোমবার (৫ অক্টোবর) অটোরিকশাচালকদের আন্দোলনের সময় কাকরাইল অডিট অফিসের সামনে তাঁর গ্যারেজের চালকদের দিয়েই গাড়ি ভাঙচুর এবং রাজধানীতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) কাশিয়ানী উপজেলার ফুকরা ইউনিয়নের ভুলবাড়িয়া এলাকায় রামদিয়া থেকে ঢাকা-খুলনাগামী মহাসড়কের দিকে যাওয়ার পথে, পাকা সড়কে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে মিছিল করেন। এ সময় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন তারা। এ ঘটনায় সোমবার (৫ অক্টোবর) কাশিয়ানী থানায় ১২১ জনের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে, বলে তথ্যে রয়েছে। তবে এই ঘটনায় নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিলে মামুনের আর্থিক সহায়তার অভিযোগ পাওয়া গেলেও কোনো এক অদৃশ্য বলয়ে ধামাচাপা পড়ে যায় তার নাম।
অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসে মামুনকে সবাই ‘শ্যাডো অডিটর জেনারেল’ হিসেবেই চিনে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তাঁদের অভিযোগ, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, ওএসডি বা রিজার্ভ, বিভিন্ন কমিটি, মিশন অডিট এবং রিমোট পোস্টিংসহ নানা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
আর এই প্রভাবের বলয় কাজে লাগিয়েই গত পাঁচ মাসে মাহমুদুল হাসান মামুন কয়েক শ কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়েছেন বলে সূত্রের দাবি। সেই সঙ্গে মামুনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে একাধিক অভিযোগের তথ্যও সামনে এসেছে বিভিন্ন সময়ে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তৈরি একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাঁর আর্থিক কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিগত সম্পর্কসংক্রান্ত নানা অভিযোগ উঠে এসেছে বলেও জানা গেছে।
জি এম মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
অন্যদিকে, এই প্রভাব-সিন্ডিকেটের আলোচনায় সামনে আসছে আরেক আলোচিত অডিটর জি এম মামুনুর রশিদের নাম। তিনি বিসিএস অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডারের কর্মকর্তা। ছাত্রজীবনে তিনি জামালপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকা কলেজের দক্ষিণায়ন হলকেন্দ্রিক ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা জানা গেছে।
এমনকি জাহাঙ্গীর কবির নানক ও শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে সখ্যতার বলয়ে, ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকায় চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা ছিলেন বলেও দাবি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। পাশাপাশি, সেই চাঁদাবাজির টাকায় ঢাকা কলেজসংলগ্ন এলাকায় তৎকালীন সময়ে, তার স্ত্রী সেরিনা আক্তারের নামে ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগও রয়েছে ফাইন্যান্স কন্ট্রোলারের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
একইসঙ্গে, ২০১৭ সালে রেলওয়ের অডিটর নিয়োগে দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত শেষে দুদক আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করলেও, সংশ্লিষ্ট জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা কোনো পদক্ষেপ নেননি; বরং তথ্য গোপন করে তাঁকে পঞ্চম গ্রেড থেকে চতুর্থ গ্রেডে পদোন্নতি দেয়া হয়।
গোপন সূত্রে জানা যায়, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, দেশের অভ্যন্তরীণ তথ্য পাচার এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জিএম মামুনকে বার্মিংহাম মিশন সফরের আদেশ দেয়া হয়। সেখানে, হাসিনার একসময়ের নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং লন্ডন মিশনের সাবেক কূটনীতিক সাইয়েদা মুনা তাসনিমের সঙ্গে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নেয়া হলে, বিষয়টি গণমাধ্যমকর্মীরা জানতে পারে। এরপর, অফিস আদেশ আড়াল করতে, মামুনের পরিবর্তে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহজাহান সিরাজকে প্রশিক্ষণ দলের সঙ্গে পাঠানো হয়। সেখানে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা হাসান মাহমুদের সাথে গোপন বৈঠকেরও অভিযোগ উঠেছে শাহজাহানের বিরুদ্ধে। আর এই পুরো বিষয়টি অবগত ছিলেন মামুন।
এদিকে, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের পেনশন অ্যান্ড ফান্ড ম্যানেজমেন্ট থেকে প্রায় ১৪ কোটি টাকা বকেয়া পেনশন দেখিয়ে লুটপাটের অভিযোগে, গোপালগঞ্জের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও অর্থ নিয়ন্ত্রক, আর্মি হাসিবুর রহমান এবং আরেক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও আর্মি লগ এরিয়ার ডেপুটি ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার মফিজুর রহমানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই তদন্তের মধ্যেই রবিবার (২৩ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত জি এম মামুনুর রশিদ, তদন্ত কর্মকর্তাদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন বলে সূত্র জানায়।
দপ্তরসংশ্লিষ্ট সূত্রের মাধ্যমে জানা যায়, ঘটনার সত্যতা আড়াল করে নিজেদের—অর্থাৎ জি এম মামুনুর রশিদকে—রক্ষা করতে, সংশ্লিষ্ট জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা তদন্ত কমিটির সঙ্গে গোপন সমঝোতা করেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০২১ সাল থেকে তদন্ত করা প্রয়োজন হলেও, কমিটি শুধু ২০২৪–২৫ ও ২০২৫–২৬ অর্থবছরের হিসাব পরীক্ষা করে প্রতিবেদন জমা দেয়।
জি এম মামুন আর মাহমুদুল হাসান মামুন—নামে যেমন মিল, কর্মেও যেন তার বিপরীত নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার ভাষ্য, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পোস্টিং, বিভিন্ন কমিটি ও অডিট টিম নির্ধারণে মাহমুদুল হাসান মামুনের মতো জি এম মামুনুর রশিদও কয়েক শ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এসব অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দেশের বাইরে পাঠানো হয় বলেও, দপ্তরে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।
এসব নিয়ে, অভিযুক্ত দুইজনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে, অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস বিভাগের এই দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রের আর্থিক স্বচ্ছতা রক্ষার দায়িত্বে থাকা দপ্তরের ভেতরেই যদি ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তবে তার প্রতিটি অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:







