রবিবার

১১ অক্টোবর, ২০২৬ ২৬ আশ্বিন, ১৪৩৩

চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কে জিম্মি সাধারণ মানুষ, বদলায় শুধু নিয়ন্ত্রণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৪৭

শেয়ার

চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কে জিম্মি সাধারণ মানুষ, বদলায় শুধু নিয়ন্ত্রণ
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

ভাইয়ের সঙ্গে আছি, কিছু করি না। পেশা সম্পর্কে জানতে চাইলে এমন উত্তরই দেন কেউ কেউ। অথচ এলাকায় তাঁদের পরিচিতি মাস্তান ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে। ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। আদায় করা অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। প্রভাবশালী এসব ব্যক্তির ভয়ে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অনেকেই চাপে থাকেন।

শহর-বন্দর থেকে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানী ঢাকার অলিগলিতে সক্রিয় চাঁদাবাজদের কারণে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা দিশাহারা। তাঁদের দিনে অন্তত তিনটি গ্রুপকে চাঁদা দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী ভয়ে এলাকা ছেড়ে থাকছেন। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ থেকেও পিছিয়ে যাচ্ছেন অনেকে।

চাঁদাবাজদের প্রভাব রয়েছে ব্যাংকঋণ বিতরণেও। অভিযোগ রয়েছে, কোনো ঋণের প্রক্রিয়া শুরু হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের খবর দিতে চাপ দেওয়া হয়। ব্যাংক ম্যানেজারদেরও শাসানো হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এসব নেটওয়ার্কের কারণে ঋণপ্রক্রিয়ায় তাঁদের হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শিল্পাঞ্চলে চাঁদাবাজির প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এ পরিস্থিতিতে অস্থিরতার মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের পাশাপাশি কখনো নিম্নমানের মালামাল নিতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। এতে রাজি না হলে হামলা ও নির্যাতনের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। আদায় করা চাঁদার অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করে দিতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ

চাঁদাবাজির সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শাসক দলের সমর্থন ও প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালানো কঠিন বলে মনে করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নির্দেশের বাইরে গেলে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি কিংবা বিশেষ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। কখনো তাঁদের ওএসডিও করা হয়।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতা চাঁদাবাজি বিস্তারের অন্যতম কারণ। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতেও দেখা যায়।

এক পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, পদোন্নতি ও পদায়ন কেনাবেচার অভিযোগের সঙ্গে চাঁদাবাজির সম্পর্ক রয়েছে। কোনো কর্মকর্তা অর্থ ব্যয় করে একটি এলাকায় দায়িত্ব পেলে প্রথমেই বিনিয়োগ করা অর্থ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। আর সেই অর্থ তুলতে গিয়ে কেউ কেউ চাঁদাবাজদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন বলে ওই কর্মকর্তার বক্তব্য।

টেন্ডার, দখলবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা

টেন্ডার নিয়েও নতুন ধরনের বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। সংবাদমাধ্যমে টেন্ডারের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরই একাধিক গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। কাজ পাওয়ার আগেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। হাটবাজার, মাঠ, ঘাট ও বালুমহালের লিজ-ইজারার ক্ষেত্রেও তাঁদের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।

শাসক দলের নেতারা এসব বিষয়ে জানলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের বাসায়ও চাঁদার ভাগ পৌঁছে যায় বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য প্রদত্ত তথ্যে নেই।

চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কের সহায়তায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, অস্ত্র ও মাদকের ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এতে অভিভাবকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। সম্প্রতি মব সন্ত্রাসের তৎপরতাও নতুন করে বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। দখলবাজির অভিযোগ উঠছে আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধেও। ঢাকায় একজন আইনপ্রণেতাকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকার বদলালেও বদলায় চাঁদাবাজির ধরন

চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ ও কার্যপদ্ধতিও বদলে যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ এর প্রভাব থেকে মুক্তি পান না। এমনকি কবরের জায়গা পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারস্থ হতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

কিছু চাঁদাবাজ চক্র দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিদেশগামী বাংলাদেশিদের ছাড়পত্র পেতে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইশারা ছাড়া কাজ এগোয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ছিনতাই ও রাহাজানি নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর মানুষের আস্থা কমছে। কমিশন বাণিজ্যও আগের তুলনায় ভিন্ন পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আগে বিদেশি ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার কথা শোনা গেলেও এখন ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব লেনদেনে ব্যাংক হিসাবের প্রয়োজন হয় না এবং ঝুঁকিও কম বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

পর্দার আড়ালে সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা চাঞ্চল্য তৈরি করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগের মধ্যে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। সরকার বদলালেও চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক নতুন রূপে সক্রিয় হয়ে ওঠার অভিযোগ থেকে যাচ্ছে।