পুরান ঢাকার আদালতপাড়ার স্থানসংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করতে নবাব আবদুল গণি রোডের বর্তমান সচিবালয় এলাকায় নিম্ন আদালত স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে সরকার। অন্যদিকে, সচিবালয় সরিয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন সচিবালয়ের ভবনগুলোর অবস্থান নির্ধারণ করে লে-আউট প্রস্তুত করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।
প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ প্রস্তাব করা হয়েছে। নকশাটি পছন্দ করার পর সরকারপ্রধান প্রকল্পটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সবুজ বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
গত আগস্টের শেষ দিকে বর্তমান সচিবালয় এলাকায় নিম্ন আদালত স্থানান্তরের বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বাস্তবায়ন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরকে নিয়ে আরও কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের লে-আউট-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা জানান, পুরান ঢাকা থেকে আদালত ভবন সরিয়ে বর্তমান সচিবালয় চত্বরে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ জন্য শেরেবাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠকে নতুন সচিবালয়ের স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তর সেখানে ২৪ একর জমির ওপর বিভিন্ন ভবনের অবস্থান নির্ধারণ করে নকশা প্রস্তুত করেছে। সরকারপ্রধান নকশাটি পছন্দ করার পর প্রকল্পটি এডিপিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরেক কর্মকর্তা জানান, সরকারপ্রধানের নির্দেশনার পর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ে শিগগির জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। অনুমোদন পেলে নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।
এডিপিতে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রয়োজনীয় তথ্য ও ব্যাখ্যাসহ যাবতীয় নথি ইতোমধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা-৩ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) এসব তথ্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা-৩-এর উপসচিব (বিকল্প কর্মকর্তা) রুবায়েত হায়াত শিপলু। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব), ভৌত অবকাঠামো বিভাগ এবং কার্যক্রম বিভাগের সদস্যের কাছে চিঠিটি পাঠানো হয়।
চিঠির বিষয় ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত ঢাকার শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।
চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি ওই অর্থবছরের এডিপিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় না থাকায় এর প্রক্রিয়াকরণ করা যাচ্ছে না। এ কারণে প্রকল্পটি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আন্তমন্ত্রণালয় প্রোগ্রামিং কমিটির সারসংক্ষেপও পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
আদালতপাড়ায় প্রতিদিন ৫০ হাজারের বেশি মানুষের ভিড়
পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় বর্তমানে ১১৮টি আদালত রয়েছে। এসব আদালতে প্রায় সাড়ে চার লাখ ফৌজদারি ও দেড় লাখ দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন। স্বাভাবিক সময়ে আদালত চলার দিনগুলোতে প্রতিদিন ৫০ হাজারের বেশি বিচারপ্রার্থী সেখানে আসেন।
আদালতপাড়ায় সব আদালতের জন্য পৃথক এজলাস নেই। কোনো কোনো আদালতকে এজলাস ভাগাভাগি করে বিচারকাজ চালাতে হয়। মামলা ব্যবস্থাপনার জন্য সেরেস্তা, নকলখানা ও রেকর্ডরুমেরও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের বসা বা বিশ্রামের জায়গা সীমিত। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং উপযুক্ত টয়লেটেরও অভাব রয়েছে। ভবনে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত লিফট নেই। গাড়ি পার্কিংয়ের নির্দিষ্ট জায়গাও নেই।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া শনিবার (১০ অক্টোবর) বলেন, পুরান ঢাকার সংকীর্ণ এলাকায় অবস্থিত আদালতপাড়ায় প্রয়োজনীয় অনেক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। আদালত সচিবালয় বা অন্য কোনো প্রশস্ত জায়গায় স্থানান্তর করা হলে সুবিধা হবে। স্থানান্তরের খবর শুনে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
নিম্ন আদালতের বিচারপ্রত্যাশী কাজী হায়দার আলী জানান, আদালতপাড়ায় বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির শেষ নেই। এজলাসে আইনজীবীদের বসার ব্যবস্থা থাকলেও বিচারপ্রার্থীদের জন্য বসার জায়গা নেই। ফলে আদালতের বারান্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। অনেক দিন সারা দিনেও বসার সুযোগ হয়নি, জায়গার অভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকির বক্তব্য জানারও চেষ্টা করা হয়। শনিবার রাতে ফোন করা হলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে ফোন করার কারণ জানিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন:







