শনিবার

১০ অক্টোবর, ২০২৬ ২৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

ঢাকার বাসে দিনে ৫২ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:০০

শেয়ার

ঢাকার বাসে দিনে ৫২ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত

ঢাকার সড়কে চলাচলকারী বাস থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয় বলে পরিবহন মালিক সমিতির তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব পাওয়া গেছে। ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় চলাচলের উপযোগী বাস রয়েছে প্রায় ছয় হাজার। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে সাড়ে চার হাজার বাস সড়কে চলে। প্রতিটি বাস থেকে গড়ে ১ হাজার ২৫০ টাকা করে আদায় হলে দৈনিক চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

সাইনবোর্ড থেকে বাইপাইল রুটে চলাচলকারী লাব্বাইক পরিবহনের একটি বাস থেকে দিনে ৩ হাজার ১৬০ টাকা চাঁদা নেওয়ার হিসাব পাওয়া গেছে। যাত্রাপথে ছয়টি নির্দিষ্ট স্থানে বাস থামিয়ে টাকা দিতে হয়। ফেরার পথেও একইভাবে ছয়টি স্থানে চাঁদা দিতে হয়। একটি বাস দিনে দুই ট্রিপে মোট ২৪ বার টাকা দেয়।

লাব্বাইক পরিবহনের একটি বাস সাইনবোর্ড থেকে বাইপাইল যাওয়ার পথে ১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং ফেরার পথে ৪৮০ টাকা দেয়। দ্বিতীয় ট্রিপে যাওয়ার পথে দিতে হয় ৫৫০ টাকা, আর ফেরার পথে ৪৮০ টাকা। সব মিলিয়ে একটি বাস থেকে প্রতিদিন ৩ হাজার ১৬০ টাকা আদায় করা হয়।

এই অর্থের মধ্যে কোম্পানির পরিচালনা বোর্ড এবং চাঁদা আদায়ে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা বাবদ ৬৯২ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। লাব্বাইক পরিবহনের বাস চলে প্রায় ৭০টি। এ হিসাবে কোম্পানির খরচের নামে প্রতিদিন ২ লাখ ২১ হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হয়। অন্যদিকে, টোলসহ কোম্পানির দৈনিক খরচ ৪৮ হাজার ৪৪০ টাকা।

লাব্বাইক পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হাসান এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কথা বলবেন না, খোঁজ নিতে হবে।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা উঠতে পারে। পরিবহন মালিকেরা কোম্পানি পরিচালনার নামে এই অর্থ আদায় করেন। তবে কোম্পানি চালাতে যতটুকু খরচ প্রয়োজন, ততটুকুই নেওয়া উচিত। লাব্বাইক পরিবহনের আদায় করা অর্থের পরিমাণ অস্বাভাবিক।

সাইফুল আলমের দাবি, এসব চাঁদার সঙ্গে সমিতির কোনো সম্পর্ক নেই। সমিতি চাঁদা তোলে না এবং এর কোনো ভাগও নেয় না। তাঁর ভাষ্য, চাঁদার বড় অংশ মালিকেরা পুলিশকেও দেন। তা না হলে পুলিশ বেশি টাকার মামলা করে বলে মালিকেরা মনে করেন। তিনি মালিকদের কাগজপত্রসহ সবকিছু ঠিক রাখার পরামর্শ দেন, যাতে পুলিশ মামলা দেওয়ার সুযোগ না পায়।

তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেছেন, চাঁদাবাজির অর্থের বড় অংশ পুলিশকে দেওয়া হয়—এ দাবির ভিত্তি নেই। তিনি পরিবহন মালিকদের সব জায়গায় চাঁদা দেওয়া বন্ধ করতে বলেন। তাঁর ভাষ্য, কাগজপত্র ঠিক থাকলে পুলিশ কীভাবে মামলা দেয়, তা তিনি দেখবেন।

সব ধরনের যানবাহন মিলিয়ে দৈনিক আদায় ২ কোটি টাকা ছাড়ায়

ঢাকায় চলাচলকারী বাসের পাশাপাশি ছোট-বড় অন্যান্য গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যান থেকে আদায় করা অর্থ হিসাব করলে দৈনিক চাঁদার পরিমাণ ২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৯৫ ধরনের টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড রয়েছে। এর মধ্যে ৬৬টি ঢাকা মহানগরীতে অবস্থিত। এসব স্থানে যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল করে। তালিকায় রয়েছে ৩৭টি লেগুনা স্ট্যান্ড, সাতটি স্থানীয় বাস স্ট্যান্ড, পাঁচটি পিকআপ স্ট্যান্ড, চারটি স্থানীয় ও আন্তজেলা বাস স্ট্যান্ড, চারটি অটোরিকশা স্ট্যান্ড, তিনটি আন্তজেলা বাস টার্মিনাল, তিনটি অটোরিকশা স্ট্যান্ড, দুটি ট্রাক স্ট্যান্ড এবং একটি মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৫৩টি পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন ২ কোটি ২১ লাখ টাকা আদায় করা হয়। এর মধ্যে পরিবহন মালিক সমিতির নামে আদায় করা হয় ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। বাকি অর্থ সিটি করপোরেশন, টার্মিনাল কর্তৃপক্ষের ফি, কাউন্টার ও টার্মিনালের খরচ এবং শ্রমিক, লাইনম্যান, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীদের ফি আদায়ের নামে নেওয়া হয়।

২০২৪ সালের ৫ মার্চ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বেসরকারি বাস ও মিনিবাস খাতে প্রতি বছর অন্তত ১ হাজার ৫৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা চাঁদা ও অনিয়মের মাধ্যমে আদায় করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস ও নবায়নসহ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে ঘুষ হিসেবে বিআরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে যায় প্রায় ৯০০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ২৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ ৮৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার প্রতিনিধি ৩৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এবং মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো অতিরিক্ত আদায় হিসেবে ১২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা নেয়।

পরিবহন পরিচালন ব্যয়ের নির্দেশিকাও মানা হচ্ছে না

সড়ক ও মহাসড়কে দীর্ঘদিনের চাঁদা আদায় বন্ধে ২০২০ সালে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো যৌথভাবে সড়ক পরিবহনে সংগঠন পরিচালন ব্যয় বা সার্ভিস চার্জ সম্পর্কিত নির্দেশিকা প্রণয়ন করে। এতে কোন যানবাহন থেকে কোথায়, কীভাবে এবং সর্বোচ্চ কত টাকা পরিচালন ব্যয় নেওয়া যাবে, তা নির্ধারণ করা হয়।

নির্দেশিকায় সড়ক বা মহাসড়কে যানবাহন দাঁড় করিয়ে চাঁদা আদায়, ২৪ ঘণ্টায় একাধিকবার টাকা নেওয়া এবং নির্ধারিত স্থানের বাইরে অর্থ সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাস থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি অথবা ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি সর্বোচ্চ ২০ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট টার্মিনাল মালিক সমিতি সর্বোচ্চ ৩০ টাকা পরিচালন ব্যয় নিতে পারবে। অর্থাৎ একটি বাস থেকে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা আদায়ের সুযোগ রয়েছে।

গাবতলী থেকে পরিচালিত বাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সর্বোচ্চ ৪০ টাকা, টার্মিনাল মালিক কমিটি ১০ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠন ৩০ টাকা নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদায়ের সীমা ৮০ টাকা।

ঢাকার চারটি বাস টার্মিনালে শ্রমিক সংগঠনগুলোর জন্য আলাদা হার নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ইউনিয়ন ৩০ টাকা, টার্মিনাল শ্রমিক কমিটি ১০ টাকা এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ১০ টাকা নিতে পারবে। এ ছাড়া বাস টার্মিনাল, ইজারাপয়েন্ট ও ইন্টারসেকশনে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের জন্য আরও ১০ টাকা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কোনো মালিক বা শ্রমিক সংগঠন জোরপূর্বক অর্থ আদায় করলে কিংবা নির্ধারিত হারের বেশি টাকা নিলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। সড়ক ও মহাসড়কে চাঁদা, কল্যাণ তহবিল, বেকার ভাতা বা অন্য কোনো নামে অর্থ আদায় নিষিদ্ধ। প্রকৃত পরিবহন শ্রমিক ছাড়া অন্য কেউ শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য হতে পারবেন না। শ্রমিক ইউনিয়নের তহবিলে মালিকদের কাছ থেকেও কোনো অর্থ নেওয়া যাবে না।

পরিবহন শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ হানিফ খোকন এই নির্দেশিকাকে অবৈধ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, শ্রম আইন ও সড়ক পরিবহন আইনে টার্মিনালের বাইরে চাঁদা তোলার সুযোগ নেই। বিভিন্ন সমিতির নেতারা মিলে নির্দেশিকা তৈরি করে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। তাঁর অভিযোগ, নির্দেশিকায় একবার চাঁদা তোলার কথা থাকলেও দিনে ৩০ বার টাকা নেওয়া হয়।

হানিফ খোকন বলেন, সরকার কঠোর না হলে এবং দলীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে না।