শুক্রবার

৯ অক্টোবর, ২০২৬ ২৪ আশ্বিন, ১৪৩৩

কাদের নেপথ্যে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়েছেন সন্ত্রাসী ‘পিচ্চি রাজা’?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:৪৮

আপডেট: ৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:৫৮

শেয়ার

কাদের নেপথ্যে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়েছেন সন্ত্রাসী ‘পিচ্চি রাজা’?
ছবি সংগৃহীত

রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা। অন্ধকার গলির অপরাধজগত থেকে হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রিজন ভ্যানের লোহার খাঁচা পেরিয়ে তার পলায়ন এখন দেশের টক অব দ্য কান্ট্রি। এক চিহ্নিত আসামির পলায়নের গল্প যেন খুলে দিয়েছে রহস্যের এক অদৃশ্য দরজা। আর সেই রহস্যময় দরজার ওপারে কে বা কারা, কীভাবে জড়িয়ে আছে রাজার পলায়নের নেপথ্যে—সেই পর্দা সরাতেই অনুসন্ধানে নামে টিম বাংলা এডিশন।

পলায়নের চাঞ্চল্যকর ভিডিওচিত্র

অনুসন্ধানের শুরুতেই বাংলা এডিশনের হাতে আসে প্রিজন ভ্যান থেকে পিচ্চি রাজার পলায়নের একটি চাঞ্চল্যকর ভিডিওচিত্র। ভিডিওতে দেখা যায়, রাজধানীর তাতীবাজারের ব্যস্ততম মহাসড়কে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে এসে থামে পিচ্চি রাজাকে বহনকারী পুলিশের প্রিজন ভ্যান। এরপর নিজ হাতে পিচ্চি রাজার জন্য গাড়ির গেট খুলে দেন ভ্যানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার। গেট খুলে দেয়ার পর ভ্যান থেকে বের হয়ে আসতে দেখা যায় পিচ্চি রাজাকে।

এমনকি ভিডিওচিত্রে পিচ্চি রাজাকে সামনে রেখে, তার ঠিক পেছনে পেছনে এসআই প্রবীর কুমারকে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যও উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। এছাড়া, পিচ্চি রাজাকে একটি প্রাইভেটকারে উঠিয়ে দেয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে এসআই প্রবীরের বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় এসআই প্রবীর কুমার, রাজার বোন তাসলিমা ও ভ্যানচালক নায়েক কামালকে সোমবার (৫ অক্টোবর) গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশের দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ী তাতীবাজারে আগে থেকেই একটি প্রাইভেটকার অপেক্ষমাণ ছিল। সেখানে পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাসহ কয়েকজন অবস্থান করছিলেন। এ সময় সাদা-লাল টি-শার্ট পরিহিত এসআই প্রবীর নিজেই পিচ্চি রাজাকে ওই প্রাইভেটকারে তুলে দিয়ে পালাতে সহায়তা করেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। পরে, ওই এসআইয়ের বাসা থেকে এ ঘটনায় নগদ ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন প্রিজন ভ্যানের এসকোর্ট ইনচার্জ আর একজন সাধারণ ভ্যানচালকের পক্ষে কি এতটা সহজেই একজন নামকরা আসামিকে সরাসরি পালানোর সুযোগ করে দেয়া সম্ভব? নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে আরও বড় কোনো পরিকল্পনা? এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রকৃত মাস্টারমাইন্ড কারা—সেই রহস্যের জট খুলতেই মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে পিচ্চি রাজার বাড়িতে সরেজমিনে উপস্থিত হয় বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী দল।

স্ত্রীর অভিযোগ: সাংবাদিক জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে

সেখানে গিয়েই প্রথমে কথা হয় পিচ্চি রাজার স্ত্রী খুশি আক্তারের সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকে একে একে বেরিয়ে আসে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা ধীরে ধীরে খুলে দিতে থাকে এই অন্ধকার জগতের নানা অধ্যায়।

খুশির দাবি, রাজার পলায়নের পেছনে তাদের কোনো হাত নেই। বরং এই ঘটনার আসল কালপ্রিট হচ্ছে রাজার বন্ধু ও দৈনিক কালবেলার সাংবাদিক জাহাঙ্গির আলম।

তিনি জানান, এর আগে সাংবাদিক জাহাঙ্গির আলম রাজার জামিনের কথা বলে তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। এমনকি কালবেলার অফিসে বসেও টাকা নেয়া হয় বলে অভিযোগ তোলে রাজার পরিবার।

অভিযোগ পাওয়া যায়, ওসি, ডিসি ও আইজিসহ জেলার, ডেপুটি জেলার এবং নানা স্তরের কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে জাহাঙ্গির ধাপে ধাপে, রাজার পরিবারের থেকে বাগিয়ে নেন প্রায় ৭০ লাখ টাকা।

এদিকে, বাংলা এডিশনের হাতে আসা ব্যাংক ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের লেনদেনের নথিতেও উঠে আসে খুশির কাছ থেকে জাহাঙ্গিরের বিশাল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার তথ্য। শুধু তাই নয়, জাহাঙ্গিরের অফিসে নগদ ২০ লাখ টাকা পৌঁছে দেয়া ব্যক্তির সঙ্গেও কথা হয় টিম বাংলা এডিশনের। তার বক্তব্যে উঠে আসে, নিজ হাতে জাহাঙ্গিরের কাছে কালবেলার অফিসে ৩০ লাখ টাকা পৌঁছে দেয়ার তথ্য।

এছাড়া, খুশির কাছে নিজেকে মাফিয়া সাংবাদিক বলে পরিচয় দিত জাহাঙ্গির। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে মাদক মামলার তথ্যও পাওয়া গেছে।

জেলার ও ডেপুটি জেলারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা

এছাড়াও, কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তৎকালীন জেলার মাসউদ ও ডেপুটি জেলার আসাদের সঙ্গে কালবেলার এই কথিত সাংবাদিকের ঘনিষ্ঠতার তথ্যও পাওয়া যায় জাহাঙ্গিরের সঙ্গে তাদের একাধিক ছবি থেকে।

সেইসাথে রাজার স্ত্রী খুশির অভিযোগ—জেলার মাসউদ ও ডেপুটি জেলার আসাদের সঙ্গে এই সাংবাদিকের ঘনিষ্ঠতা এতটাই গভীর ছিল যে, কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই তাদের অফিসে বসে খুশির সঙ্গে রাজাকে একাধিকবার ভিডিওকলে কথা বলার সুযোগ করে দেয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, রাজাকে ডিটেনশন সেল থেকে ওয়ার্ডে শিফট করানোর জন্য জাহাঙ্গিরের মাধ্যমে মাসউদ, আসাদসহ চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চারটি লেটেস্ট মডেলের আইফোন রাজার পরিবারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়।

জাহাঙ্গিরের ওপর ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দুইজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর আসা এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ অনুসন্ধানের আরও গভীরে নিয়ে যায়। সেই ধারাবাহিকতায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যায় বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী দল।

সেখানে গিয়েই জাহাঙ্গিরের সঙ্গে জেলার মাসউদের গভীর সখ্যতার কথা উঠে আসে কারাগারের নিরাপত্তায় থাকা একজনের বক্তব্যে।

তবে, জাহাঙ্গিরের জেলারের কক্ষে যাতায়াতের বিষয়টি অস্বীকার করেন জেলার নিজেই।

প্রথমে জাহাঙ্গিরের তাঁর অফিসে যাতায়াতের বিষয়টি অস্বীকার করেন জেলার মাসউদ। কিন্তু যেই জাহাঙ্গিরের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের তথ্য তুলে ধরা হয়, সুর বদলাতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি তিনি। সেই সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি স্বীকার করলেও, সেটিকে নিছক দুপুরের খাবার খাওয়ার ঘটনা বলে এড়িয়ে যান এই কর্মকর্তা।

অন্যদিকে, পিচ্চি রাজাকে ডিটেনশন সেল থেকে ওয়ার্ডে স্থানান্তরের জন্য জাহাঙ্গির তাকে আইফোন দিয়েছেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, নিজের কাছে একটি আইফোন থাকার কথা স্বীকার করেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তবে সেটি পিচ্চি রাজার দেয়া আইফোন কি না, তা অনুসন্ধান করতে হবে বলে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেন তিনি।

জেলার মাসউদের বক্তব্য নেয়ার ঠিক পরপরই যাওয়া হয় ডেপুটি জেলার আসাদের কাছে। এ বিষয়ে তাঁর মন্তব্য জানতে কারাগারের গেইটের বাইরে অপেক্ষা করা হয় দীর্ঘক্ষণ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেখা পাওয়া যায় আসাদের। তবে তাঁর সঙ্গে জাহাঙ্গিরের ছবি দেখিয়ে রাজার পরিবারের দেয়া আইফোনের প্রসঙ্গ তুলতেই কোনো মন্তব্য না করে তড়িঘড়ি সটকে পড়েন তিনি।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলারদের ছাড়াও কাশিমপুর কারাগারের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গেও সাংবাদিক জাহাঙ্গিরের সুসম্পর্কের কথা জানা যায়। এমনকি কাশিমপুরের জেলার জাহাঙ্গিরের বন্ধু বলেও জানান রাজার স্ত্রী।

সিদ্ধিরগঞ্জে জাহাঙ্গিরের সম্পত্তি

একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য, আর তার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর সব অভিযোগ। অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় এবার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে জাহাঙ্গিরের এলাকায় যায় টিম বাংলা এডিশন। সেখানে গিয়ে মেলে আরও অবিশ্বাস্য তথ্য—জাহাঙ্গিরের মালিকানায় রয়েছে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি ও পাঁচতলা একটি ভবন। শুধু তাই নয়, এলাকার অনেকের সঙ্গেই কথা বলে জানা যায়, জাহাঙ্গির সাংবাদিকতা করেন—এমন তথ্যই তাঁদের জানা নেই।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সাংবাদিকতা করে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি, তার সঙ্গে পাঁচতলা ভবনের মালিকানা কীভাবে সম্ভব? আর এই প্রশ্নের সূত্র ধরেই সামনে আসতে থাকে পিচ্চি রাজার পলায়নের নেপথ্যের নানা রহস্য।

একদিকে জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ, উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। অন্যদিকে, জেলারের স্ববিরোধী কথাবার্তা, আর ডেপুটি জেলারের কাছে আইফোনের প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর তড়িঘড়ি সরে পড়া—সবকিছু মিলিয়ে সামনে আসে একটি প্রশ্নই, রাজার পালানোর সাথে আসলে কতজন জড়িত?

তাহলে কি মাদক সম্রাট খ্যাত পিচ্চি রাজার প্রিজন ভ্যান থেকে পলায়নের নেপথ্যে সাংবাদিক জাহাঙ্গির, জেলার মাসউদ ও ডেপুটি জেলার আসাদই মূল হোতা? নাকি তাঁদের পেছনেও রয়েছে আরও কোনো বড় রাঘববোয়াল? আর সেই কারণেই কি এসআই প্রবীর ও ভ্যানচালককে বানানো হয়েছে বলির পাঁঠা? উত্তর মিলবে সঠিক তদন্তে।