বুধবার

৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২ আশ্বিন, ১৪৩৩

মধ্যরাত থেকে ইলিশ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু

ইমরান হোসেন, পটুয়াখালী

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:২২

আপডেট: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৪০

শেয়ার

মধ্যরাত থেকে ইলিশ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু
ছবি সংগৃহীত

মা ইলিশের বাধাহীন প্রজনন নিশ্চিত করতে বুধবার (৭ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে সমুদ্র ও নদীতে ইলিশ ধরার ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা মেনে গভীর সমুদ্র থেকে তীরে ফিরছেন জেলেরা। এরই মধ্যে পটুয়াখালীর অন্যতম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র মহিপুর-আলিপুর, কুয়াকাটা ও রাঙ্গাবালীসহ উপকূলের হাজারো জেলে বিভিন্ন নদনদীতে ফিরে এসেছেন।

তবে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আবারও ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় জেলেদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের দাবি, এখনও ইলিশের পেটে ডিম আসেনি। ইলিশের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৎস্য অধিদফতরের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা। এরপরও সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়েছেন জেলেরা।

জেলেরা নিষেধাজ্ঞার সময়ে দেশের জলসীমায় পার্শ্ববর্তী দেশের জেলেদের আগ্রাসন বন্ধে নৌবাহিনীসহ প্রশাসনের কঠোর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি প্রকৃত জেলেদের মধ্যে প্রণোদনার পরিমাণ বাড়িয়ে সঠিক সময়ে তা বিতরণের দাবি তাদের।

শেষ সময়ের বেচাকেনায় ব্যস্ত মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র

নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে মৎস্য অবতরণকেন্দ্রগুলোতে চলছে শেষ সময়ের বেচাকেনা। ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতিতে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলো সরগরম হয়ে উঠেছে।

কুয়াকাটা আশার আলো জেলে সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি নিজাম শেখ বলেন, সমুদ্রে মাছ শিকার করতে গিয়ে বেশিরভাগ জেলেই শূন্য হাতে তীরে ফিরছেন। আগের মতো সাগরে মাছ ধরা পড়ছে না। দেশি-বিদেশি ট্রলিং বোটের পাশাপাশি ভারতীয় জেলেদের আধিপত্য চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব বন্ধে সরকারের কোনো উদ্যোগ না থাকলেও বারবার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে জেলেদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

জেলে আব্দুর রহিম বলেন, সাগরে এমনিতেই মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে আবার নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। সরকারি আইন মানতেই হবে। তবে সরকার যে প্রণোদনা দেয়, তা সঠিক সময়ে পাওয়া যায় না এবং চাহিদার তুলনায় পরিমাণও কম। তাই জেলেদের দাবি, দেওয়া চালের পরিমাণ বাড়িয়ে সঠিক সময়ে তা বিতরণ করা হোক।

ট্রলারের মাঝি সোলায়মান বলেন, বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংকের ঋণের পাশাপাশি জেলেদের দাদনের বোঝাও রয়েছে। ঋণের এই চাপ নিয়ে জেলে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সব ব্যবসায়ী হতাশায় রয়েছেন।

নিষেধাজ্ঞায় নজরদারি বাড়ানোর দাবি

মহিপুর মৎস্য আড়তদার সমবায় মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান ফজলু গাজী বলেন, গত দুই-তিন বছর ধরে সাগরে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। যখন কিছুটা মাছ পাওয়া যায়, তখনই আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায়। নিষেধাজ্ঞার সময়ে বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করা উচিত। নিষেধাজ্ঞার সুযোগে বার্মা ও ভারতীয় জেলেরা দেশের জলসীমায় ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার সমিতির নেতা আব্দুল জলিল ঘরামি বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার প্রতি সম্মান রেখে জেলেরা বুধবার মধ্যরাতের আগেই সমুদ্র থেকে তীরে ফিরে আসবেন। এরই মধ্যে অনেক ট্রলার মৎস্য অবতরণকেন্দ্রসহ বিভিন্ন আশ্রয়স্থলে এসে নোঙর করেছে। জেলেরাও বাড়ি ফিরে গেছেন।

তিনি বলেন, চলতি বছর ইলিশের আকাল গেছে। কিছু জেলে মাঝে মধ্যে ট্রলারে মাছ পেলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে একের পর এক দুর্যোগের কারণে জেলেরা সমুদ্রে যেতে পারেননি। সেই নিষেধাজ্ঞার রেশ কাটতে না কাটতেই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা জেলে ও আড়তদারদের হতাশ করেছে। তারা এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।

আব্দুল জলিল ঘরামির ভাষ্য, চলতি বর্ষা মৌসুমেও জেলেদের দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সমুদ্রে মাছ না থাকায় জেলে ও আড়তদারদের ধারদেনা করে চলতে হয়েছে। এরপরও জেলেরা সরকারের আইন মেনে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছেন।

১৮ হাজার নিবন্ধিত জেলেকে প্রণোদনা দেওয়া হবে

কলাপাড়া সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, মা ইলিশসহ সামুদ্রিক সব ধরনের মাছের প্রজনন মৌসুম চলছে। সমুদ্রে মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এতে মৎস্যজীবীরাই লাভবান হবেন।

তিনি বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালে কলাপাড়া উপজেলার ১৮ হাজার নিবন্ধিত জেলেকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে। নিবন্ধনের বাইরে থাকা জেলেদেরও পর্যায়ক্রমে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে।

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বাজারজাত করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন বলে জানিয়েছেন এই মৎস্য কর্মকর্তা।