বুধবার

৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২ আশ্বিন, ১৪৩৩

টাকার বিনিময়ে কলরেকর্ড বিক্রি, চার পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:১৫

আপডেট: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:১৭

শেয়ার

টাকার বিনিময়ে কলরেকর্ড বিক্রি, চার পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

মুঠোফোনের গোপন তথ্য কেনাবেচাকে ঘিরে অনলাইনে একটি বাজার গড়ে উঠেছে। টাকা দিলেই এই বাজার থেকে মানুষের মুঠোফোনের অবস্থান, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), ক্ষুদেবার্তা (এসএমএস), মুঠোফোনের আর্থিক লেনদেনের বিবরণী, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্টের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন, ওয়েবসাইট, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এসব তথ্য বিক্রি করছে একাধিক অসাধুচক্র।

এ ধরনের তথ্য ফাঁস ও টাকার বিনিময়ে বিক্রির অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে রাজধানীর রমনা থানায় মামলা হয়েছে। চার পুলিশ সদস্যের সঙ্গে আরও কারা জড়িত, তা শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগ।

গ্রেপ্তার চার পুলিশ সদস্য হলেন ডেমরা থানার পুলিশ কনস্টেবল সাইমন হোসেন রাশেদ (কং/৬৭৪০), একই থানার পুলিশ কনস্টেবল মাসুম মিয়া (কং/২৭৯৩২), ওয়ারী থানার পুলিশ কনস্টেবল নিজাম উদ্দীন (কং/২৬৪৯৭) এবং তুরাগ থানার পুলিশ কনস্টেবল মো. জিহাদ মিয়া (কং/৩৪১৮)।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) গোয়েন্দা পুলিশের এসআই আবিদুর রহমান বাদী হয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধি আইনে মামলা করেন। সরকারি কর্মচারী হয়েও প্রতারণার মাধ্যমে বেআইনিভাবে মুঠোফোনের সিডিআর সংগ্রহ করে সামাজিক মাধ্যমে বিক্রি, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর এবং নাগরিকের সিম বা মোবাইল নম্বরের কললিস্ট, লাস্ট কল লোকেশন ও এনআইডিসহ তথ্য বেআইনিভাবে সংগ্রহ, হস্তান্তর ও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মামলা হওয়ার পর চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইয়াছিন মিয়া জানান, কয়েকদিন আগে ডিবির সাইবার ক্রাইম বিভাগ থেকে মামলাটি করা হয়েছে। মামলাটি ডিবির সংশ্লিষ্ট বিভাগ তদন্ত করছে।

ভুয়া মামলা-জিডি দেখিয়ে সিডিআর সংগ্রহ

মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ডিবির সাইবার মনিটরিংয়ের সময় বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ফেসবুকের একটি অ্যাকাউন্ট, একটি হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট এবং একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে বিভিন্ন মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর বিক্রির বিষয়টি নজরে আসে। পরে অনুসন্ধানে একটি বিকাশ নম্বরে সিডিআর বিক্রির টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

এর মধ্যে মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে ডিবিকে জানানো হয়, ডিবির এলআইসি থেকে সরকারি একটি মুঠোফোন নম্বরের মাধ্যমে তিনটি নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করে পরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর বিষয়টি অনুসন্ধানে নামে গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগ।

এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, তুরাগ থানার সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ১১টি মুঠোফোন নম্বরের তিন মাসের সিডিআর ও এনআইডির তথ্য চাওয়া হয়েছিল। আবেদনে তুরাগ থানার একটি জিডি নম্বর এবং একজন এএসআইয়ের নাম ব্যবহার করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই নম্বরের জিডি থানায় নথিভুক্তই হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট এএসআইও এমন কোনো সিডিআর চাননি।

এজাহার অনুযায়ী, তুরাগ থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত কনস্টেবল জিহাদ মিয়া থানার ওসির সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ভুয়া জিডির তথ্য দিয়ে সিডিআর সংগ্রহ করেন। পরে তা বিভিন্ন ব্যক্তি ও সামাজিক মাধ্যমে পাঠানোর প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।

একইভাবে ডেমরা থানার ওসির সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে চারটি মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর চাওয়া হয়। আবেদনে ডেমরা থানার একটি মামলার নম্বর ও এক এসআইয়ের নাম ব্যবহার করা হলেও অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই মামলা থানায় রুজুই হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট এসআইও ওই নম্বরগুলোর সিডিআর চাননি। এই সিডিআর সংগ্রহের সঙ্গে কনস্টেবল সাইমন হোসেন রাশেদ ও মাসুম মিয়ার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সামাজিক মাধ্যমে সিডিআর বিক্রির অভিযোগ

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, কনস্টেবল নিজাম উদ্দীন ডেমরা থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত থাকার সময় সিডিআর সংগ্রহ করে সামাজিক মাধ্যমে বিক্রি করতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পরে ওয়ারী থানায় বদলি হওয়ার পরও থানার ওসির ই-মেইল ব্যবহার করে বিভিন্ন নম্বরের সিডিআর সংগ্রহের তথ্য পাওয়া যায়।

তাঁর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ ও মুঠোফোন পর্যালোচনায় বিভিন্ন নম্বরের সিডিআর আদান-প্রদান এবং টাকা গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

চার পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে থাকা হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে এমন তথ্য পাওয়া গেছে যে, তাঁরা বিভিন্ন সময়ে থানার ওসিদের সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ভুয়া মামলা বা জিডির নম্বর দেখিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের এলআইসি থেকে সিডিআর সংগ্রহ করতেন। পরে এসব তথ্য সামাজিক মাধ্যমে বিক্রি করে অর্থ নিতেন। তাঁদের কয়েকজন থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় সরকারি ই-মেইল ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিলেন।

সরকারি তথ্য ব্যবস্থার অপব্যবহারের ঝুঁকি

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্তের প্রয়োজনে মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে নাগরিকের মুঠোফোন ব্যবহারের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে। হত্যা, অপহরণ, ছিনতাইসহ বিভিন্ন মামলার তদন্তে সন্দেহভাজন ব্যক্তির সিডিআর বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়। এ জন্য থানার কর্মকর্তারা অনেক সময় মোবাইল অপারেটরের কাছে তথ্য চেয়ে সরকারি ই-মেইল বা চিঠি পাঠান। এসব কাজের একটি অংশ অধস্তন সদস্যরা সম্পন্ন করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, একজন ব্যক্তি মুঠোফোনে কাকে কল করেন, কে তাঁকে ফোন করেন এবং কী কী খুদে বার্তা বিনিময় হয়, এসব তথ্য মোবাইল অপারেটরগুলো সংরক্ষণ করে। মোবাইল অপারেটরদের তথ্যভান্ডারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাসহ ১২টি সংস্থার প্রবেশাধিকার রয়েছে। ফলে একটি সংস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বা অসাধু সদস্যের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য পরে বৃহত্তর একটি চক্রের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর আগে রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়েছিল। তখন জানানো হয়েছিল, ওই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারও যোগসাজশের তথ্য পাওয়া যায়নি। এবার চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় সরকারি ব্যবস্থায় সংরক্ষিত নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, নাগরিকের কললিস্ট, অবস্থান, এনআইডি বা আর্থিক লেনদেনের তথ্য ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়। এসব তথ্য অপরাধী চক্রের হাতে গেলে প্রতারণা, হয়রানি, চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেলিং এমনকি গুরুতর অপরাধেও ব্যবহার হতে পারে। তাঁর মতে, তথ্য সংগ্রহের প্রতিটি ধাপে কে আবেদন করছেন, কোন মামলা বা জিডির ভিত্তিতে তথ্য চাওয়া হচ্ছে, কে তথ্য গ্রহণ করছেন এবং পরে সেই তথ্য কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, এসব বিষয়ে শক্তিশালী অডিট ট্রেইল ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (টিজিআই) গত আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৬টি সরকারি ও ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের তথ্য ফাঁসের ঘটনাও ঘটে। ২০২৩ সালেও ৫ কোটি মানুষের এনআইডির তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছিল।