বুধবার

৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২ আশ্বিন, ১৪৩৩

আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ, চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:২৮

শেয়ার

আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ, চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা
ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী শহীদ আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ। ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতনে নিহত হন তিনি। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তৎকালীন কয়েকটি চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে দেওয়া তার স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে এ হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নমত দমন ও শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত করে নানা অভিযোগ সামনে আসে।

সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে এবার সরকারিভাবে কোনো কর্মসূচির তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে আজ বুধবার বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) উদ্যোগেও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

যেভাবে প্রাণ হারান আবরার

বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়ি থেকে বুয়েটের হলে ফেরেন। ওই রাত ৮টার দিকে তাকে শেরেবাংলা হলের দোতলার ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে পাঠান তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত কয়েকজন বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, তার মোবাইল ফোন ঘেঁটে ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে ভারতবিরোধী স্ট্যাটাস ও মতাদর্শের প্রমাণ পাওয়ার পর তাকে ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে মারধর শুরু করা হয়। পরে চতুর্থ বর্ষের কয়েকজন নেতাকর্মী এসে তার ওপর আবারও নির্যাতন চালান।

রাতভর নির্যাতনের একপর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়েন। হত্যাকারীরা তার নিথর দেহ সিঁড়িতে ফেলে রেখে রাতের খাবার খেতে যায় বলে বর্ণনায় উঠে এসেছে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তার লাশ সিঁড়ি থেকে হলের ক্যান্টিনে নিয়ে রাখা হয়। ভোরে তা ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।

হলের সিসিটিভি ফুটেজে কয়েকজনকে আবরারকে ধরাধরি করে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। সে সময় হল প্রাধ্যক্ষ জাফর ইকবাল খান জানিয়েছিলেন, রাত পৌনে ৩টায় খবর পেয়ে বুয়েটের চিকিৎসক পরীক্ষা করে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন।

বুয়েটের পরিবেশ নিয়ে নানা অভিযোগ

আবরার হত্যাকাণ্ডের মূল দৃশ্যপটে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা থাকলেও এ হত্যাকাণ্ডের পরিবেশ তৈরিতে বুয়েটের ‘আড়ি পেতে শোনা’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপের ভূমিকা ছিল বলে অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠে আসে। গ্রুপটির বিরুদ্ধে ভিন্নমতাবলম্বী ও ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে নির্যাতনের পরিবেশ তৈরির অভিযোগও ছিল।

২০১২ সালে যাত্রা শুরু করা গ্রুপটি ২০১৩ সালের শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় থেকে শাহবাগপন্থি ও ইসলামবিদ্বেষী অবস্থান নেয় বলে অভিযোগ করা হয়। গ্রুপের তৎকালীন অ্যাডমিন প্যানেল বুয়েটকে শিবিরমুক্ত করার প্রচার জোরদার করে। এর অংশ হিসেবে ২০১৪ সালে গ্রুপটিতে ৪৪ জনের একটি নিষিদ্ধ তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকায় শিবির বা সরকারবিরোধী মত পোষণকারী শিক্ষার্থীদের নামও ছিল বলে অভিযোগ করা হয়।

তালিকায় থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্তত ১৪ জন ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হন বলে জানা যায়। তালিকা তৈরি ও প্রকাশে তৎকালীন অ্যাডমিন প্যানেলের সদস্য জাভেদ ইকবাল (মেকানিক্যাল-৮৯), মিশকাত আল আলভি (ইইই-০৭), মাসুদ করিম খানসহ (সিএসই-৮৯) অনেকে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গ্রুপটির চিহ্নিত সদস্যরা তালিকা প্রকাশের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়, যেখানে শিবির আখ্যা দিয়ে কাউকে নির্যাতন করাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হতো না। বিভিন্ন পোস্টে নির্যাতনকে ন্যায্য প্রমাণের জন্য যুক্তি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগ শিবিরমুক্ত করার নামে অভিযান চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। ধর্মভীরু শিক্ষার্থীদেরও শিবির আখ্যা দিয়ে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ করা হয়। এ ধরনের পরিবেশে নির্যাতিত শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতেও সহপাঠীরা ভয় পেতেন বলে বর্ণনায় উঠে এসেছে।

এ ছাড়া ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বুয়েটে ছাত্রলীগের বিভিন্ন নির্যাতনের বিষয়ে প্রশাসন অবগত ছিল এবং কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং নির্যাতনে সহযোগিতা করেছে—এমন অভিযোগও ওঠে।

২৫ আসামির বিচার, মৃত্যুদণ্ড ২০ জনের

আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ছাত্রলীগের ২৫ জনকে আটক করা হয়। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর আদালত ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স হিসেবে ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি মামলার নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়।

২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলাটির শুনানি শুরু হয়। পরে হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের দেওয়া ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করলেও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেনি।

এখন চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা। সাত বছর আগে সংঘটিত এ মামলার দুই ধাপের বিচার শেষ হলেও চূড়ান্ত বিচার শেষ হতে কত সময় লাগবে, তা বলতে পারছে না কোনো পক্ষই।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরে চলা পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শিক্ষার্থীদের মতে, আবরার হত্যাকাণ্ড ছিল বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি পরিবেশের পরিণতি। পরবর্তী সময়ে আবরার ফাহাদ আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হন।



আরও পড়ুন: