সম্প্রতি বাংলা টিভির কথিত সাংবাদিক প্রান্ত পারভেজকে নিয়ে বাংলা এডিশন এর ডিজিটাল বিভাগে একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হয়।
প্রতিবেদনের মূল বিষয়বস্তু ছিল, মিরপুরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে তার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভূমিকা, চাঁদাবাজি এবং কথিত সাংবাদিকতার বিস্তার অভিযোগ নিয়ে।
সংবাদটি প্রকাশের পরপরই চরম অসন্তুষ্ট হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সরাসরি লাইভে হাজির হন এই কথিত সাংবাদিক। লাইভে এসে তিনি বাংলা এডিশনের প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বানোয়াট’ বলে দাবি করেন।
কিন্তু, কেন এই আকস্মিক লাইভ? মূলত, বাংলা এডিশনের আগের প্রতিবেদনে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পারিবারিক তথ্য নিয়ে সত্য তুলে ধরা হয়েছিল।
সেই সত্য ঢাকতেই লাইভে এসে এক অবিশ্বাস্য কান্ড ঘটান পারভেজ, নামের প্রসঙ্গ টেনে তিনি নিজের জন্মদাতা পিতাকেই সরাসরি অস্বীকার করে বসেন।
লাইভে দাবি করেন, তার বাবা-মা নাকি সবাই বিদেশে থাকেন।
পারিবারিক তথ্যে ভিন্ন চিত্র
তবে, বাংলা এডিশনের সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আকাশচুম্বী ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। পারভেজের জনস্থান ও গ্রামের বাড়ী সিরাজগঞ্জের রূপগঞ্জে যেয়ে মেলে ভিন্ন তথ্য।
বাড়ীতে তার বাবাকে না পাওয়া গেলেও ক্যামেরার সামনে পারভেজের দাদি হাসনা ভানু জানান, পারভেজের মা পারভীন বেগম বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। বিদেশে যাওয়ার পূর্বে স্বামী আনিসুরকে এক থেকে দুই মাসের মধ্যে সৌদিতে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। স্ত্রীর কথায় বিশ্বাস করে আনিসুর নিজের জমিজমা ও যাবতীয় সম্পদ বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ স্ত্রী ও তার সাংবাদিক ছেলে পারভেজের হাতে তুলে দেন। এরপর স্ত্রীকে বিদেশে পাঠানো হলেও, পরবর্তীতে আনিসুরকে আর সৌদি আরবে নেয়া হয়নি।
পরে, পারভেজ এবং তার মায়ের প্রতারণার কারণে, আনিসুর অনত্র গিয়ে আকেটি বিয়ে করে, বাড়ী ছাড়েনে বলে জানা যায়।
কথিত সাংবাদিক প্রান্ত পারভেজের বাবা আগের প্রতিবেদনে দাবি করেন, তার ছেলে স্কুলের গণ্ডিই পেরোয়নি।
ভুয়া সার্টিফিকেটের অনুসন্ধান
এছাড়া, বাংলা এডিশনের আগের প্রতিবেদনে, আনিসুরের বরাত দিয়ে বলা হয়, পারভেজ স্কুলের গণ্ডি অর্থ্যাৎ এসএসসি পাস না করেই সাংবাদিক বনে গেছেন। তবে, ওই তথ্যের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে, পারভেজ দাবি করেন তিনি এসএসসি, এমনকি এইচএসসিও পাস করেছেন। তাঁর দাবির প্রেক্ষিতে, তিনি প্রদর্শন করেন, ওই দুই পরীক্ষায় পাসের দুটি সার্টিফিকেট। সেই সার্টিফিকেটের সূত্র ধরেই এরপর অনুসন্ধানে নামে টিম বাংলা এডিশন।
তিনি দাবি করেন, ২০০৪ সালে ঢাকার আলহাজ্ব আব্বাস উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে সরকারি বাঙলা কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষায় এইচএসসি পাস করেন।
মূলত, লাইভ ভিডিওর স্ক্রিনশট থেকে সংগ্রহ করা হয় পারভেজের এসএসসি ও এইচএসসি পাস সার্টিফিকেটের দুটি ছবি। সেখানে দেখা যায়, এসএসসিতে পারভেজের রোল নম্বর ৪০৩৮০৩ এবং এইচএসসিতে রোল নম্বর ৯০৫০৮৫ আর উভয় পরীক্ষারই রেজি. নম্বর-৯৮৭৮৮৭। এরপর, প্রথম ধাপে, সার্টিফিকেটে থাকা ওই রোল এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর নিয়ে সরকারি শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে টিম বাংলা এডিশন। কিন্তু অনলাইনে, দুই পরীক্ষারই রোল নম্বর টাইপ করতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘ভুল তথ্য’ বা ইনভ্যালিড ডেটা। এরপর সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়।
অনলাইনের এই অসংগতি দেখে সত্যের খোঁজে টিম বাংলা এডিশন ছুটে যায়, ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে। অফিশিয়াল নথিপত্র ঘেঁটে বের করা হয়, পারভেজের এসএসসির সার্টিফিকেটের রোল নম্বরের, বিপরীতে থাকা আসল রেজিস্ট্রেশন নম্বর।
এরপর সেই সঠিক রেজিস্ট্রেশন আর রোল নম্বর দিয়ে অনলাইনে সার্চ দিলে, ফলাফলে যা দেখা গেল, তাতে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। ওই রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরে নাম দেখা যায় এক নারী শিক্ষার্থীর। যার নাম আফরিন আখতার। তিনি, রাজধানীর শেরে বাংলা নগর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। অর্থাৎ অন্য এক ছাত্রীর রোল নম্বর চুরি করে তৈরি করা হয়েছে, পারভেজের এসএসসির ভুয়া সার্টিফিকেট। অন্যদিকে, পারভেজের সার্টিফিকেটে দেখানো এইচএসসির রোল নম্বরের বিপরীতে কোনো রেজিস্ট্রেশন নম্বর পাওয়া যায়নি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে।
এখানেই শেষ নয়। ভুয়া সার্টিফিকেটের নজির আছে আরো। এসএসসির সার্টিফিকেটে মায়ের নামের জায়গাতেও দেখানো হয়েছে পারভেজের নাম। অর্থ্যাৎ, যিনি পরীক্ষার্থী তিনিই আবার মা।
প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যা পাওয়া গেল
জালিয়াতির এই ভয়ংকর জাল উন্মোচনে টিম বাংলা এডিশন হাজির হয় পারভেজের দাবি করা প্রতিষ্ঠান, ‘আলহাজ্ব আব্বাস উদ্দিন হাই স্কুলে’। তার দাবি অনুযায়ী, এই স্কুল থেকেই এসএসসি পাস করেছেন পারভেজ। তবে, স্কুলে গিয়ে দায়িত্বরত শিক্ষক ও কর্মীদের সাথে কথা বলতেই, বেরিয়ে আসে জালিয়াতির সব রহস্য। দায়িত্বরতরা জানান, পারভেজের দেখানো রোল নম্বরের কোনো অস্তিত্ব নেই তাদের স্কুলে। অর্থ্যাৎ, ওই রোল নম্বরে পারভেজ নামের কেউ কোনোদিন পরীক্ষাই দেয়নি তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে এই প্রতারণাকে চরম অন্যায় উল্লেখ করে, উল্টো প্রতারকের কঠোর শাস্তির দাবি জানায় প্রতিষ্ঠানে কর্তরতরা।
এসএসসি-র জালিয়াতি প্রমাণের পর, প্রান্তর দাবি করা এইচএসসি সনদের রহস্য ভেদ করতে টিম বাংলা এডিশন যায় সরকারি বাংলা কলেজে।
পারভেজের দাবি অনুযায়ী, ২০০৬ সালে বাংলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। তবে, সরেজমিনে ওই কলেজে খোঁজ নিয়েও পাওয়া যায়নি সত্যতা। ২০০৬ সালে বাংলা কলেজ থেকে বাণিজ্য শাখায় পাস করা, তালিকায় নেই পারভেজের নাম। এমনকি পারভেজের দেখানো রোল আর রেজিস্ট্রেশন নম্বরেরও কোনো অস্তিত্ব নেই কলেজের নথীপত্রে।
কলেজের প্রশাসন বিভাগের প্রধান সহকারী আলমগীর হোসেন মোল্লা বলেন, ওই সার্টিফিকেট সঠিক নয়। যারা এই জাল সনদ তৈরির সাথে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
একইসাথে সরকারি বাংলা কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবি, যারা ভুয়া সার্টিফিকেট তৈরি করে তাদের প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
এসব প্রমাণ নিয়ে, বক্তব্য জানতে চাইলে, এলোমেলো-দিকভ্রান্ত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন প্রান্ত পারভেজ।
অন্যান্য অভিযোগ
অকাট্য এসব তথ্যে এখন এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, প্রান্তর দেখানো দুটি সনদই ছিল এক নিখুঁত জালিয়াতির ফসল। তবে শুধু এই ভুয়া বা জাল সার্টিফিকেটই নয়, বাংলা এডিশনের আগের প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয়েছিল এই কথিত সাংবাদিকের অপরাধের সুবিশাল সাম্রাজ্য!
জনতার আলো, অনলাইন পোর্টাল খুলে সারা দেশে প্রতিনিধি নিয়োগের নামে চাঁদাবাজি, নিজেকে সেনা কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়া, পর্নোগ্রাফি মামলা, জমি দখল, এমনকি থানায় একাধিক বিস্ফোরক ও মারামারির মামলা রয়েছে তার নামে।
নিজের জন্মদাতা পিতাকে অস্বীকার করা থেকে শুরু করে একাধিক অপরাধে অভিযুক্ত প্রান্ত পারভেজ সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে ঢাল বানিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন বারবার। জাল সার্টিফিকেট তৈরি করে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো এই কথিত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়— তা-ই এখন দেখার বিষয়।
আরও পড়ুন:







