মঙ্গলবার

৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২১ আশ্বিন, ১৪৩৩

জাপানের সঙ্গে বিরোধে ১১ বছর ঝুলে ভারতের বুলেট ট্রেন

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:০৪

শেয়ার

জাপানের সঙ্গে বিরোধে ১১ বছর ঝুলে ভারতের বুলেট ট্রেন
ছবি সংগৃহীত

জাপানের কম সুদের ঋণ ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ভারতে প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ১১ বছর ধরে নানা জটিলতায় আটকে আছে মুম্বাই-আহমেদাবাদ উচ্চগতির রেলপথ। সরঞ্জাম কেনাকাটা, প্রযুক্তি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে ভারত ও জাপানের মতভেদ সাম্প্রতিক সময়ে আরও প্রকাশ্য হয়েছে।

মহারাষ্ট্রের মুম্বাই থেকে গুজরাটের আহমেদাবাদ পর্যন্ত ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ ভারতের রেল নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের অন্যতম প্রধান প্রকল্প। ২০১৫ সালে দুই দেশ ৯৮০ বিলিয়ন রুপির, তৎকালীন হিসাবে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের, চুক্তিতে সম্মত হয়। এর আওতায় জাপান ৫০ বছরের জন্য দশমিক ১ শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে।

প্রকল্পটি ২০২৩ সালে চালুর প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে জমি অধিগ্রহণের জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে কাজ বারবার পিছিয়ে যায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় বেড়ে এখন অন্তত ১ দশমিক ৮৭ ট্রিলিয়ন রুপিতে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ১৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

সিগন্যালিং ব্যবস্থা নিয়ে দুই দেশের মতভেদ

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে ভারত ও জাপানের মতবিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। জাপানের সাবেক বিচারমন্ত্রী হিদেকি মাকিহারা জুলাইয়ে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে প্রকল্পের অগ্রগতি না হওয়ার জন্য ভারতীয় পক্ষকে দায়ী করেন। তিনি ভারতীয় পক্ষের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার অভিযোগও তোলেন।

জাপানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, চুক্তির শর্ত ভেঙে ভারত সিগন্যালিং ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ জার্মান কোম্পানি সিমেন্সকে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্স জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী। এতে জেআর ইস্টের নেতৃত্বে থাকা জাপানি কোম্পানিগুলো হতাশ হয়েছে বলে জানা গেছে।

জাপানের অবস্থান হলো, বুলেট ট্রেনের নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করতে পুরো ব্যবস্থাকে একীভূত রাখতে হবে। তবে জাপানি রেললাইন, ইউরোপীয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং ভারতীয় ট্রেনের সমন্বয়ে যে ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, সেটি আগে কোথাও পরীক্ষা করা হয়নি।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক জাপানি সূত্রের মতে, পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়েছে যে আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। তবে জেআর ইস্ট এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো, প্রকল্পটি তদারকির জন্য জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন একটি পদ সৃষ্টি করেছে টোকিও। অন্যদিকে ভারত নিজস্ব উচ্চগতির ট্রেন তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছে, যার সক্ষমতা জাপানের কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের সমতুল্য হবে।

রেল মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, দুই পক্ষই বর্তমানে একই অবস্থানে রয়েছে। বিস্তারিত আলোচনা ও সম্মতির পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নিজস্ব উচ্চগতির রেল ব্যবস্থায় জোর ভারতের

নরেন্দ্র মোদি সরকারের রেলব্যবস্থা আধুনিকায়নের উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত পুরোনো রেল নেটওয়ার্ক আধুনিক করার পাশাপাশি এটি মেক ইন ইন্ডিয়া উদ্যোগেরও অংশ। এরই মধ্যে ভারত তার ব্রড-গেজ রেলপথের ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ বিদ্যুতায়িত করেছে। আহমেদাবাদ-মুম্বাই রুটে ভারতীয় তৈরি সেমি-হাই-স্পিড বন্দে ভারত ট্রেনও চলছে।

রেল মন্ত্রণালয় আরও সাতটি উচ্চগতির করিডর নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এসব করিডরের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। এতে ১৬ ট্রিলিয়ন রুপি, প্রায় ১৬৭ বিলিয়ন ডলার, বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য রয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, আগামী গ্রীষ্মে প্রথম পর্যায়ে অন্তত ১০০ কিলোমিটার অংশে ভারতীয় তৈরি ধীরগতির ট্রেন চালু করা হবে। তবে জাপানি কূটনীতিকদের মতে, প্রথম ধাপ হবে মাত্র ৫০ কিলোমিটার। সময়সূচি নিয়েও তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

প্রযুক্তি ও খরচে ভিন্ন অবস্থান

প্রযুক্তি ও খরচের বিষয়ে ভারতীয় ও জাপানি পক্ষের অবস্থান আলাদা। ভারতীয় আলোচকেরা স্থানীয় উৎপাদন, ব্যয় কমানো এবং ভবিষ্যতে নিজস্ব সক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগকে গুরুত্ব দিয়েছেন। জাপান পুরো ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত প্যাকেজ হিসেবে রাখতে চায়।

ভারতীয় পক্ষ মনে করে, জাপানি পক্ষের আচরণে এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্বের মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে, যা তাদের বিরক্ত করেছে। জাপানি কূটনীতিকরাও স্বীকার করেছেন, দেশটির করপোরেট খাতে বাইরের বিশ্বের প্রতি অন্তর্মুখী মানসিকতা দুই দেশের দূরত্ব বাড়িয়েছে।

এক জ্যেষ্ঠ জাপানি কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, জাপানিরা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং সেগুলো ভালোভাবে বাস্তবায়ন করে। অন্যদিকে ভারতীয়রা তুলনামূলকভাবে উঁচু লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করলেও তা বেশ ভালোভাবে সম্পন্ন করে।

রেল মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্পের প্রথম অংশের নির্মাণকাজ ২০২৭ সালের শুরুতে শেষ হতে পারে। তবে জাপানের পরবর্তী প্রজন্মের ই১০ ট্রেন সরবরাহের সম্ভাব্য সময় ২০৩০-এর দশকের শুরু। ফলে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া এবং কাঙ্ক্ষিত ট্রেন সরবরাহের সময়ের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকছে। ট্রেনটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার হতে পারে।

বিরোধের মধ্যেও ভারত-জাপান সম্পর্কের গুরুত্ব

প্রকল্প নিয়ে বিরোধ থাকলেও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষাপটে ভারত-জাপান সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। জুলাইয়ে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দুই দেশের সম্পর্ককে ভাই-বোনের মতো আরও ঘনিষ্ঠ করার কথা বলেন।

যৌথ বিবৃতিতে জাপান ভারতের আগামী বছর সীমিত পরিসরে উচ্চগতির রেল চালুর লক্ষ্যকে পুরোপুরি বুঝতে পারছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেছেন, উচ্চগতির রেল প্রকল্পের গতির চেয়ে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতি এখন অনেক বেশি।