মঙ্গলবার

৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২১ আশ্বিন, ১৪৩৩

দেশে দরিদ্র বেড়েছে প্রায় ২১ লাখ, চাকরি হারিয়েছেন নারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:১২

শেয়ার

দেশে দরিদ্র বেড়েছে প্রায় ২১ লাখ, চাকরি হারিয়েছেন নারীরা
ছবি সংগৃহীত

২০২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত থেমে গেছে এবং বিশেষ করে নারীরা চাকরি হারিয়েছেন।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অন্যতম বড় সমস্যা রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা। ২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং নতুন ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এসব সংস্কার জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

দরিদ্রদের অর্ধেকের কাছেই নেই সামাজিক সুরক্ষা

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করছে। তবে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।

এ কারণে সীমিত সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে সরকারের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

সংস্থাটির মতে, এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যভিত্তিকভাবে উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন মানুষকে কর্মসূচিতে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচি একীভূত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির আরও ভালো সমন্বয় করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছে সংস্থাটি।

প্রবৃদ্ধিতে চাপ, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানিসংকট, কম রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম গতি পেলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমছে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগ কমেছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি হারিয়েছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে।

তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের বৈদেশিক খাত কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে বহিঃখাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই হার ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত দূর করা। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে

একই দিনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে।

প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশকে নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে দক্ষতা, অবকাঠামো ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।