শনিবার

৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮ আশ্বিন, ১৪৩৩

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু নিয়ে কাটেনি অস্পষ্টতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৫:৫৭

আপডেট: ৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৫:৫৮

শেয়ার

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু নিয়ে কাটেনি অস্পষ্টতা
ছবি সংগৃহীত

অস্পষ্টতার মধ্যেই শুরু হয়েছে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) একটি রিক্রুটিং এজেন্সির দেওয়া ২৮ বাংলাদেশি কর্মীর নিয়োগপত্র বা ডিমান্ড লেটার সত্যায়ন করেছে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ২৮ সেপ্টেম্বর ডিমান্ড লেটার সত্যায়ন করা হয়েছে। পরদিন মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দেওয়া চিঠিতে এটিকে পরীক্ষামূলক বলা হলেও এটি পরীক্ষামূলক নয়, বাস্তব প্রক্রিয়ার অংশ।

তবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিকভাবে খুলেছে কি না, তা স্পষ্ট করেননি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, গণমাধ্যম ও এ বিষয়ে গবেষণাকারীদের নিয়ে দু-এক দিনের মধ্যে গোলটেবিল বৈঠক করা হবে। সবার মতামত নিয়ে কীভাবে যাত্রা শুরু করা হবে, তা নির্ধারণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী সপ্তাহে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বৈঠকটি হতে পারে।

অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই বছর বন্ধ থাকার পর শ্রমবাজার চালুর প্রক্রিয়ায় এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। কোন খাতে এবং কবে থেকে কর্মী পাঠানো যাবে, সে বিষয়ে সরকার কোনো নির্দেশিকা দেয়নি। সাধারণত এসব নির্দেশিকায় প্রক্রিয়ার বৈধতা, দায়িত্ব ও খরচের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ব্যক্তিদের মধ্যে অতিরিক্ত গোপনীয়তা দেখা যাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।

২৫ এজেন্সির তালিকা, যুক্ত হয়েছে বোয়েসেল

সৌদি আরবের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেমিট্যান্স পাঠানো দেশ মালয়েশিয়া। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। সিন্ডিকেট, দুর্নীতি ও অতিরিক্ত ফির অভিযোগে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে দেশটির শ্রমবাজার স্থগিত হয়ে যায়।

শ্রমবাজার চালুর প্রক্রিয়ায় ২১ আগস্ট মালয়েশিয়ার বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করে। পরে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড বা বোয়েসেলকে যুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সহযোগী করা হয়।

গঠন করা হয়েছে পাঁচ সদস্যের তদারকি কমিটি

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম তদারকিতে পাঁচ সদস্যের সমন্বয় ও তদারকি কমিটি গঠন করেছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) উপসচিব মো. আনিছুর রহমানের স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ আদেশ জারি করা হয়।

কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদকে এবং সদস্য সচিব করা হয়েছে উপসচিব হেদায়েতুল ইসলাম মণ্ডলকে। অন্য সদস্যরা হলেন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হাফিজুর রহমান চৌধুরী, বোয়েসেলের নির্বাহী পরিচালক মো. শওকত আলী এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অতিরিক্ত পরিচালক মো. শরিফুজ্জামান।

আদেশে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহির আওতায় আনতে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বোয়েসেল এখনো কোনো চিঠি পায়নি

২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, বাংলাদেশের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে জিরো কস্টে নিতে সম্মত হয়েছে। বোয়েসেলের মাধ্যমে প্রথম ব্যাচ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানোর কথা জানানো হয়েছিল।

তবে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চিঠি পায়নি বলে জানিয়েছেন বোয়েসেলের নির্বাহী পরিচালক মো. শওকত আলী। তিনি জানান, ২০২৪ সালে আটকে পড়া কর্মীদের এখনো পাঠানো হচ্ছে।

২১ আগস্ট ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশের পর এজেন্সিগুলো ডিমান্ড লেটার সংগ্রহ করছে। তবে বোয়েসেল সেভাবে কাজ আনতে পারছে না। মালয়েশিয়ার যে কোম্পানি জিরো কস্টে কর্মী নেবে, তারা চাহিদা দিলেই বোয়েসেলের মাধ্যমে কর্মী পাঠানো শুরু হবে।

তাড়াহুড়ো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন। তাঁর মতে, তাড়াহুড়ো করেই শ্রমবাজার চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে। আগে প্রক্রিয়া ঠিক করে পরে বাজার চালু করলে তা আরও স্বচ্ছ হতো বলে তিনি মনে করেন।

আসিফ মুনীরের মতে, সরকার দ্রুত বাজার চালু করে রাজনৈতিক কৃতিত্ব নিতে চাইছে এবং আগের সরকারের সময়ে যা সম্ভব হয়নি, বর্তমান সরকার তা করতে পেরেছে—এটি প্রমাণের চেষ্টা থাকতে পারে। তিনি ধীরগতিতে এগিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া তৈরির পক্ষে মত দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, প্রক্রিয়া তৈরির সময় অভিবাসন বিশেষজ্ঞ, এনজিও, রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধি, শ্রমিক সংগঠন ও গণমাধ্যমসহ সব অংশীজনকে যুক্ত করা উচিত। তাঁর দাবি, বর্তমানে আলোচনায় বেসরকারি মহলকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না; বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।