শুক্রবার

২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

মাদক কারবারিদের ট্র্যাপ; প্রবাসীদের ব্যবহার করে ইয়াবা ব্যবসা

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:০৬

শেয়ার

মাদক কারবারিদের ট্র্যাপ; প্রবাসীদের ব্যবহার করে ইয়াবা ব্যবসা
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

দৃশ্যত এটি গ্যাস্ট্রিকের সাধারণ ওষুধের প্যাকেট। ফয়েল পেপারের সিলও একেবারেই অক্ষত। কিন্তু, ওপরের প্রলেপ সামান্য সরাতেই বেরিয়ে আসে এক ভয়ঙ্কর সত্য।

ওষুধের মোড়কে সুকৌশলে বসানো হয়েছে মরণনেশা ইয়াবার পাত। ১২টি প্যাকেটে লুকানো ৩৬০ পিস ইয়াবা, যার বাজারমূল্য লক্ষাধিক টাকা। এভাবেই অভিনব কায়দায় নিরীহ প্রবাসীদের কাঁধে, বন্দুক রেখে সৌদি আরবে মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে একটি সংঘবদ্ধ মাফিয়া চক্র।

প্রথম চালান উদ্ধার

পর্দার আড়ালে থাকা এই চক্রের মুখোশ প্রথম উন্মোচিত হয় শনিবার (১ আগস্ট)। চাঁদপুরের শাহরাস্তির ভোলদিঘী বাজারে, হাক্কানী ট্রেডার্সে একটি স্কচটেপ মোড়ানো ব্যাগ রেখে যান সৌদি প্রবাসী আরিফের স্ত্রী রুনা আক্তার।

কথা ছিলো, ব্যাগটি মালড়া গ্রামের সৌদি আরবগামী যাত্রী রাশেদের কাছে পৌঁছে দেয়ার। ব্যাগের অস্বাভাবিক ওজন ও আকৃতিতে সন্দেহ হয় দোকান মালিক এনায়েত হোসেনের। তিনি একা না খুলে, স্থানীয়দের ডেকে মোবাইল ক্যামেরায় ভিডিও সচল করে প্যাকেটটি খোলেন। আর তাতেই বেরিয়ে আসে ইয়াবার প্রথম চালান। এরপর তিনিই পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে ইয়াবা জব্দ করে এবং বেলাল হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে।

দ্বিতীয় চালান ও আরিফের পলায়ন

এই চালান ভেস্তে যাওয়ায় আগস্টের মাঝামাঝি সৌদি থেকে দেশে ফেরে চক্রের হোতা আরিফ। এবার তার টার্গেট সুজন মিয়া নামের আরেক সৌদিগামী প্রবাসী।

বন্ধু মাহমুদুল হাসানের মালামাল পাঠানোর কথা বলে আরিফ ও তার সহযোগী অনিক, সুজনের কাছে ইয়াবার প্যাকেট হস্তান্তরের চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের অস্বাভাবিক কথাবার্তায় সন্দেহ হয় সুজনের। তিনি আশপাশের মানুষ জড়ো করে প্যাকেট চেক করতেই বেরিয়ে আসে ইয়াবা। জনতা অনিককে ধরে ফেললেও, সুকৌশলে দৌড়ে পালিয়ে যান আরিফ।

ঘটনার পর মাহমুদুল হাসানের একটি ফোনালাপ বাংলা এডিশনের হাতে এসেছে। যেখানে সৌদি আরবগামী যাত্রী, সুজন মিয়ার চালানটি নিয়ে কথা বলতে শুনা যায়।

চক্রের ব্লু-প্রিন্ট

জানা যায়, এই আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের পুরো ব্লু-প্রিন্ট। চক্রের মূল হোতা বা গডফাদার চাঁদপুরের শাহরাস্তির মালোরা ভূইয়া বাড়ির আনোয়ার হোসেনের ছেলে মহিন উদ্দিন বসে থাকে সৌদি আরবে। তার অর্থায়নে দেশে আসা প্রবাসীদের টার্গেট করে উপজেলার পাটোয়ারী বাড়ির আমির হোসেনের ছেলে মাহমুদুল হাসান। আর দেশে নিখুঁতভাবে ওষুধের প্যাকেটে ইয়াবা ভরে প্রবাসীদের হাতে তুলে দেয়ার কাজটি করে মালোরা ভূইয়া বাড়ির মো. মমিনের ছেলে আরিফ ও তার স্ত্রী রুনা আক্তার।

চক্রের অন্যতম হোতা মাহমুদুলের স্ত্রী নুসরাত আক্তারের ফাঁস হওয়া একটি কল রেকর্ড বাংলা এডিশনের হাতে এসেছে। সেখানে তিনি নিজেই এই পাচার বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য স্বীকার করেছেন।

মাহমুদুলের অতীত

চক্রের অন্যতম এই হোতা মাহমুদুল হাসানের অতীত ঘাঁটতে গিয়ে মিলেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। তিনি শুধু আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্যই নয়, দেশেও একজন চিহ্নিত মাদক কারবারি।

পুলিশ রেকর্ড বলছে, ২০২৪ সালের শুক্রবার (২১ জুন), রাত পৌনে ১১টায় শাহরাস্তির কাজিরকামতা এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালায় পুলিশ। স্থানীয় এক চায়ের দোকানের সামনে থেকে ২০ পিস ইয়াবাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় শাহরাস্তির মেহের এলাকার মাহমুদুল হাসানকে। কিন্তু আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে সে আবারও বেপরোয়া হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারে।

অন্যদিকে, চক্রের অন্যতম সদস্য মহিনউদ্দিন এক ফোনালাপে স্বীকার করেন, তিনি দেশ থেকেই ইয়াবা নিয়ে আসতেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই চক্রের অপতৎপরতা নিয়ে, সচেতনতামূলক লেখালেখি করায়, সাধারণ নাগরিকদের হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে এই চক্রের অন্যতম হোতা মহিন উদ্দিনের বিরুদ্ধে।

পাচারের সুকৌশলী পদ্ধতি

তবে, এই পাচারের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সুকৌশলী ও ভয়ংকর। সাধারণ প্রবাসীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের পাতার ভেতরে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ইয়াবা লুকিয়ে রাখা হতো।

মহিনসহ এই চক্রটি মূলত সাধারণ যাত্রী বা প্রবাসীদের না জানিয়েই এই অবৈধ কারবার পরিচালনা করত। দেশে ফেরা যাত্রীদের হাতে “ওষুধ বা জরুরি জিনিসপত্র” হিসেবে সেসব ধরিয়ে দিয়ে, কৌশলে নিরাপদে মাদক পাচার করত এই সিন্ডিকেট।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিমানবন্দরের এত কড়া নিরাপত্তা ও স্ক্যানার ফাঁকি দিয়ে এই মাদক যায় কীভাবে? এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা জানায়, চক্রটি ওষুধের জেনুইন ব্লিস্টার প্যাকগুলো কেটে ভেতরে ইয়াবা ভরে পুনরায় মেশিনের সাহায্যে হিট-সিল করে দেয়। ফলে এক্স-রে মেশিনে অনেক সময় এটিকে সাধারণ ওষুধ মনে হয়।

সবমিলিয়েই, বিদেশগামী যাত্রীদের ওষুধ বহনের কৌশলে অভিনব কায়দায় বিদেশে পাচার করা হচ্ছে ভয়ংকর মাদক। চক্রটি সাধারণ যাত্রীদের বা তাদের লাগেজ মাধ্যম বানিয়ে বিভিন্ন দেশে মাদক পাচার করার বিষয়ে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানতে, একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সৌদিতে কালো টাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড

অনুসন্ধানে মিলেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। ওষুধের মোড়কে যাওয়া এই ইয়াবা সৌদি আরবে বিক্রি হয় চড়া দামে। এই মাদকের কালো টাকা দিয়ে সেখানে বিশাল এক আন্ডারওয়ার্ল্ড গড়ে তুলেছে চক্রটি। তারা যাত্রী সেজে গাড়ি ছিনতাই, বাংলাদেশ থেকে নতুন যাওয়া প্রবাসীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়সহ নানা জঘন্য অপরাধের সাথে যুক্ত। মূলত ইয়াবার টাকাই জোগান দেয় তাদের অন্যান্য অপরাধের।

এ বিষয়ে শাহরাস্তি মডেল থানার পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রের বিরুদ্ধে দুটি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং এর কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে গ্রেপ্তার আসামিদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তে যাদের নাম ও সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুতই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

একের পর এক এমন ঘটনায় সৌদি আরবে বসবাসরত সাধারণ প্রবাসীদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রবাসীদের দাবি, মুষ্টিমেয় কিছু অপরাধীর কারণে বিদেশের মাটিতে গোটা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এবং দূতাবাস দ্রুত এই চক্রের শিকড় উপড়ে না ফেললে, অচিরেই হুমকির মুখে পড়বে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শ্রমবাজার।