২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শুধু ফ্যাসিবাদী শাসনেরই ইতি ঘটেনি, বরং পরিবর্তন হয়েছে ফ্যাসিবাদী অনেক সংস্কৃতিও। যার ধারাবাহিকতায় ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির শাহাদাতের পর, তার স্মরণার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’।
নাম সরানোর ঘটনা
কিন্তু সময়ের পালাবদলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ আবারও ফিরে যাচ্ছে ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নামে। জানা গেছে, বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরের দিকে হলের প্রধান ফটক থেকে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামটি সরিয়ে ফেলা হয়।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও দাবি
এরপর থেকেই সংশ্লিষ্ট হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে জন্ম নেয় তীব্র ক্ষোভ। তাঁদের দাবি, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিবাদের কোনো আইকন তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখতে চায় না। এমনকি হলটির নাম যদি শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ফিরে যায়, তাহলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ এ নিয়ে ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা করতে পারে বলেও মত তাদের। এই অবস্থায় শহীদ ওসমান হাদির নামেই হলটির নাম বহাল রাখা হোক—এমনটিই প্রত্যাশা হলের শিক্ষার্থীদের।
তবে এর বিপরীতে ভিন্ন মতও উঠে আসে শিক্ষার্থীদের থেকে। অনেক শিক্ষার্থীর মতে, হলের নাম পরিবর্তন হলে বিভিন্ন বিভ্রান্তিতে ভুগতে হয় সংশ্লিষ্ট হলে থাকা শিক্ষার্থীদের।
প্রশাসনের বক্তব্য
অপরদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তার কাছ থেকেও উঠে আসে বিভ্রান্তির বিষয়টি। তিনি জানান, হলের নাম নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার কারণে প্রশাসনের উদ্যোগেই নামটি মুছে ফেলা হয়েছে।
এদিকে, হলটির নাম শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ফেরানোর বিষয়ে, বাংলা এডিশনের সাথে কথা হয় ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের। শিক্ষার্থীদের মতামত উপেক্ষা করে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নাম মুছে ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নামে ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা করা হলেও, শিক্ষার্থীরা ফ্যাসিবাদের কোনো আইকনকে ঢাবিতে ফিরতে দিবে না বলেই মন্তব্য করেছেন সাদিক কায়েম।
জানা যায় এর আগে, হলটির নাম পরিবর্তনের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সিনেট অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ অন্যান্য ছাত্রনেতারা। ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জন্ম নেয় পক্ষে-বিপক্ষে নানা বিতর্ক।
অন্যদিকে, হলের নামটি পূর্বের নামে ফেরানোর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকী। শহীদ ওসমান হাদির নামে হলটির নামকরণের জোর দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, সিন্ডিকেটে হলের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হলেও, তা অনুমোদিত হয়নি। ফলে বর্তমানে প্রশাসনিকভাবে যে নাম কার্যকর রয়েছে, সেটিই বহাল থাকবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
ঐতিহাসিক নজির
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিভ্রান্তি এড়ানোর যুক্তিতে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সরানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের নাম বদলের সংস্কৃতি মোটেও নতুন নয়। বরং সময় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পালাবদলে এর আগেও বদলেছে একাধিক হলের নাম। ১৯৬৬ সালের ‘জিন্নাহ হল’ স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে হয় ‘মাস্টারদা সূর্য সেন হল’; একইভাবে ১৯৫৭ সালের ‘ইকবাল হল’ বদলে রাখা হয় ‘জহুরুল হক হল’, যা ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল’ নাম পায়।
একাধিকবার হলের নাম পরিবর্তনের নজির থাকলেও, তবে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সরিয়ে শহীদ ওসমান হাদির নামে নামকরণের ক্ষেত্রে বাধা কোথায়? উঠেছে সেই প্রশ্ন। নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে কোনো বিশেষ স্বার্থ বা যোগসাজশ—যার কারণে পুরো বিষয়টি ঘিরে ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে ধোঁয়াশার কালো মেঘ? ফলে, একটি নামের পরিবর্তনকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই ধোঁয়াশার শেষ কোথায়? রয়েছে সেই অপেক্ষা। আর শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত কোন পথে যায়—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশজুড়ে।
আরও পড়ুন:







