ফেনীর আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলা। যে মামলার পরতে পরতে বোনা হয়েছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের এক নিখুঁত ষড়যন্ত্রের জাল। দীর্ঘ সাত বছরের আইনি লড়াই আর জেলের অন্ধকার প্রাচীর পেরিয়ে, অবশেষে উচ্চ আদালতের রায়ে, শতভাগ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন এই ১০ জন মানুষ। পেয়েছেন মুক্তির স্বাদ।
বাংলা এডিশন কার্যালয়ে খালাসপ্রাপ্তদের আগমন
মুক্তির পর বুধবার কারামুক্ত এই ১০ জন সরাসরি ছুটে আসেন রাজধানীর লালমাটিয়ায়, নিউজ পোর্টাল ‘বাংলা এডিশন’ কার্যালয়ে। এসময়, দীর্ঘ বঞ্চনার শিকার হওয়া এই মানুষদের, উষ্ণ অভ্যর্থনা আর ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেয় বাংলা এডিশন কর্তৃপক্ষ।
মুক্তির আনন্দে অশ্রুসিক্ত এই মানুষগুলো, গভীর কৃতজ্ঞতা জানান বাংলা এডিশনের চেয়ারম্যান ও সাহসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের প্রতি।
কারাগারে পৈশাচিক নির্যাতনের অভিযোগ
তবে, এই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে বুকফাটা কান্না আর পৈশাচিক নির্যাতনের লোমহর্ষক ইতিহাস। সাবেক পিবিআই প্রধান বনজ কুমারের নেতৃত্বে, জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তাদের ওপর নেমে এসেছিল মধ্যযুগীয় বর্বরতা। ইলেকট্রিক শক, হাত ঝুলিয়ে পেটানো কিংবা নখ উপড়ে ফেলার মতো হাড়হিম করা নির্যাতন চলেছে দিনের পর দিন।
শুধু তাই নয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছিল মোটা অঙ্কের অর্থও।
শান্তিতে ঘুমাতে বা দাঁড়াতে পর্যন্ত দেয়া হয়নি তাদের। অমানুষিক সেই অত্যাচারে কেউ হারিয়েছেন শ্রবণশক্তি, কারও মেরুদণ্ডে তীব্র ব্যথা, শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা জটিল ব্যাধি।
কারাজীবনের এই অন্ধকূপে থাকা অবস্থায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন অনেকের জন্মদাতা পিতা অথবা স্বজনরা। শেষ সময়ে বাবার মুখখানা দেখার, কিংবা একটু ছায়া পাওয়ার সুযোগটুকুও কেড়ে নেয়া হয়েছিল তাদের কাছ থেকে।
মিথ্যা মামলার ঘানি টানতে গিয়ে এখন সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব এই পরিবারগুলো। তছনছ হয়ে গেছে তাদের জীবনও।
শিশু মোবাশ্বেরা খানম রাখির করুণ গল্প
তবে, সব নিষ্ঠুরতাকে যেন হার মানায় নিষ্পাপ শিশু মোবাশ্বেরা খানম রাখির গল্প। পৃথিবীর আলো দেখার পর যে শিশুর প্রথম ঠিকানা হওয়ার কথা ছিল মায়ের আঁচল আর বাবার আদর, অথচ তার জন্ম আর বেড়ে ওঠা জেলের অন্ধকার চার দেয়ালে। ২০১৯ সালে বিচার চলাকালে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়, কথিত মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়, কামরুন্নাহার মনিকে।
রিমান্ডে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি গর্ভের সন্তান নষ্ট করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে মনির কাছ থেকে আদায় করা হয় কাল্পনিক জবানবন্দি। এই অবস্থাতেই জেলের প্রকোষ্ঠে, মনির গর্ভ থেকে জন্ম নেয় রাখি। খেলার মাঠ বা রঙিন পুতুলের সামর্থ্য না থাকায়, ফেলে দেয়া কাপড় আর মোজা দিয়ে মায়ের বানানো পুতুলই ছিল শিশু রাখির একমাত্র খেলার সাথী।
বাকি ছয়জনের মুক্তি ও সহায়তার দাবি
তারা মুক্ত আকাশে নিঃশ্বাস নিলেও, তাদের আনন্দ এখনো শতভাগ অপূর্ণ। কারণ, এই সাজানো মামলায় তাদের কাছের আরও ৬ জন এখনও বন্দি কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে। অবিলম্বে মামলাটি পুনর্বিবেচনা করে, বন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তির আকুল আকুতি জানিয়েছে তারা।
একইসাথে, জীবনের অমূল্য সময়, অপূরণীয় ক্ষতি ও ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবনের জন্য সরকারের কাছে উপযুক্ত সহায়তার দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগীরা।
দীর্ঘ মতবিনিময় আর জেলের ভেতরকার বঞ্চনার গল্প ভাগ করে নেয়ার পর, দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে, বাংলা এডিশনের পক্ষ থেকে কারামুক্তদের মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়ন করা হয়।
ইলিয়াস হোসাইনের সাহসী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
তবে, দিনশেষে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসে, কেন সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের প্রতি তাদের এই অশেষ কৃতজ্ঞতা? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পেছনের এক সাহসী অধ্যায়ে। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে, তৎকালীন হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন প্রকাশ করেছিলেন ‘ফিফটিন মিনিটস’ নামের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
সেই সাহসী সংবাদেই প্রথম দেশবাসীর সামনে প্রমাণসহ উঠে আসে, নুসরাতকাণ্ড কোনো হত্যা নয়, পুরোটাই ছিল আত্মহত্যার এক নিখুঁত ছক।
আরও পড়ুন:







