২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বদলেছে বাংলাদেশ, বদলেছে রাজনৈতিক চিন্তাধারাও। বদলে গেছে, দীর্ঘদিনের অনেক রাজনৈতিক বয়ান, পাল্টেছে ইতিহাসকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও। ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের যে অধ্যায় ইতিহাসে লিপিবদ্ধ, সেই ইতিহাস যখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে, তখন সেই বদলে যাওয়া বাস্তবতার বিপরীতে গিয়ে মুজিব বন্দনাতেই যেন ব্যস্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
বই বিক্রিতে বাধা ও তালা ঝুলানোর ঘটনা
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বাংলাবাজারে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের বিক্রয়কেন্দ্রে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রি নিয়ে আপত্তি তোলেন দুই যুবক। একপর্যায়ে বইটিকে নিষিদ্ধ দাবি করে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের বিক্রয়কেন্দ্রে তালা ঝুলিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটে।
আসিফ নজরুলের ফেসবুক পোস্ট
এরই পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তাঁর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে একটি পোস্ট করেন। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কোনো নিষিদ্ধ বই নয় বলে, মন্তব্য করতে দেখা যায় তাঁকে।
পাশাপাশি পোস্টে বিক্রয়কেন্দ্রটিতে তালা ঝুলিয়ে দেয়া এবং বই বিক্রিতে বাধা দেয়াকে বেআইনি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বলে উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাকে শেখ হাসিনার শাসনামলের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে ফ্যাসিবাদী আচরণের পুনরাবৃত্তি হিসেবেও উল্লেখ করেন সাবেক এই উপদেষ্টা। পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা।
মুজিবপ্রীতির পুরোনো নিদর্শন
তবে, সাবেক এই আইন উপদেষ্টার মুজিবপ্রীতির এই নিদর্শন নতুন কিছু নয়। এর আগেও তাঁর বিভিন্ন লেখা ও বক্তব্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ইতিবাচক অবস্থানের নজির সামনে এসেছে। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে আসিফ নজরুলের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ‘প্রিয় বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে একটি কবিতা প্রকাশ করা হয়। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের গুণকীর্তনে পঞ্চমুখ হতে দেখা যায় তাঁকে। কবিতায় বলা হয়—মুজিবকে ভালোবাসতে হলে আওয়ামী লীগ হওয়ার প্রয়োজন নেই। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পালাবদলের পর তাঁর সেই কবিতা সামনে আসতেই শুরু হয় ব্যাপক বিতর্ক।
আওয়ামী লীগের প্রতি ইতিবাচক মন্তব্য ও অভিযোগ
এছাড়াও বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের প্রতি তাঁর ইতিবাচক মন্তব্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে। যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তাঁর অবস্থানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে—এমন আলোচনা রয়েছে বিভিন্ন মহলে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত গান বাংলার তাপসের জামিন এবং বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়ার অভিযোগও উঠেছে আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে।
শুধু তাপস নয়, ফ্যাসিবাদী আমলের সাবেক আমলা, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাসহ বিভিন্ন মামলার আসামিদের অর্থের বিনিময়ে জামিনের ব্যবস্থা করার অভিযোগ রয়েছে আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সময়ে নানা মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, ব্যবসায়ী, সাবেক আমলা ও আওয়ামী লীগ নেতাসহ অন্তত দুই ডজন ব্যক্তির জামিনে আসিফ নজরুলের হস্তক্ষেপ ছিল এবং এসব জামিনের বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
একদিকে জুলাইয়ের চেতনা, অন্যদিকে স্বাধীন বাংলার প্রথম স্বৈরাচারখ্যাত শেখ মুজিবের বন্দনা; আবার একদিকে আওয়ামী লীগবিরোধী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠদের জামিন দেয়ার অভিযোগ—আসিফ নজরুলের জুলাইয়ের প্রতি তাঁর অবস্থানকেই শুধু প্রশ্নের মুখে ফেলছে না, প্রশ্ন তুলছে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা ও স্বচ্ছতা নিয়েও।
আরও পড়ুন:







