মঙ্গলবার

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩

মিরপুরে তিন ভাইয়ের বাহিনী, তিন এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯:০১

শেয়ার

মিরপুরে তিন ভাইয়ের বাহিনী, তিন এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুরে জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ঝুট ব্যবসা, কেবল টেলিভিশন ও ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন অপরাধে কয়েকটি বাহিনীর নাম উঠে এসেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থান করা চারজনের নিয়ন্ত্রণে মিরপুরে চারটি অপরাধী দল সক্রিয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাহিনীটির নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মফিজুর রহমান মামুন।

মামুন মালয়েশিয়ায় অবস্থান করে পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকায় চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা, জমি দখল ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন বলে পুলিশ সূত্রের দাবি। তাঁর দুই ভাই মো. জামিল রহমান ও মশিউর রহমান দেশে থেকে বাহিনীর কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আবাসন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলীর প্রায় ২৮ কাঠা জমি রয়েছে পল্লবী থানার বাইগারটেক এলাকায়। জমিটির চারদিকে সীমানাপ্রাচীর এবং ভেতরে পাঁচটি টিনের ঘর ছিল। তিনি জানান, ৩০ এপ্রিল রাতে একদল সন্ত্রাসী বুলডোজার দিয়ে সীমানাপ্রাচীর ও ঘরগুলো ভেঙে জমি দখল করে নেয়। এরপর থেকে তিনি সেখানে যেতে পারছেন না।

মোহাম্মদ আলীর দাবি, জমিটির মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা। মামুন বাহিনীর সদস্যরা সেটি দখল করেছেন এবং মামুনের ভাই মশিউর রহমান তাঁকে জমিতে যেতে নিষেধ করেছেন।

মিরপুরে চার বাহিনীর তৎপরতার অভিযোগ

পুলিশ ও মিরপুর এলাকার বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের একাধিক নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মামুন ছাড়া আরও তিনটি অপরাধী দলের তৎপরতা রয়েছে।

ভাষানটেক থানা বিএনপির ১ নম্বর আহ্বায়ক মো. ইব্রাহিম ওরফে কিলার ইব্রাহিম ও তাঁর অনুসারীরা মিরপুর-১৩, মিরপুর-১৪, ভাষানটেক ও কালশী এলাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মিরপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহাদত হোসেন ও তাঁর অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মিরপুর-১, মিরপুর-২ ও মিরপুর-৬ নম্বর এলাকা। আর মোক্তার নামের আরেক ব্যক্তির অনুসারীরা মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ নম্বরের কিছু এলাকায় সক্রিয় বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, এই চার বাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে বড় মামুনের বাহিনী। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা ও একাধিক অপরাধের মামলা রয়েছে। বাহিনীতে দেলোয়ার হোসেন রুবেল, মো. রফিকুল, আলমগীর, মোতালেব, রাজন, সামি, ভাগনে মামুন, সোহেল, কায়েস, সেলিম, প্রকাশ, সুজন, হাবিব, সাগর, রোকন, শামিম ও জনিসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে। জনি ও রোকন মিরপুরের যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশ গত মার্চে রাজধানীর চাঁদাবাজদের একটি তালিকা তৈরি করে। থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, পুলিশের বিশেষ শাখা এবং ডিএমপি কমিশনারের গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্য নিয়ে করা ওই তালিকায় মিরপুরের সাতটি থানার এলাকায় ৭২ জন চাঁদাবাজের নাম রয়েছে। তাঁদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবে ২৫ জনের নাম রয়েছে। তালিকায় মামুন ও তাঁর দুই ভাইয়ের নামও রয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

মামুনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার তথ্য

পুলিশ জানিয়েছিল, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামুনকে গ্রেপ্তারের সময় তাঁর বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় চাঁদাবাজি, খুন, মাদক, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার ও ডাকাতির অভিযোগে ২৭টি মামলা ছিল। একই সঙ্গে ১৫টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও দুটি সাজা পরোয়ানার তথ্যও পাওয়া যায়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মামুন ২০০৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে যান। ২০০৮ সালে পাসপোর্ট জালিয়াতি ও অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ভারতে গ্রেপ্তার হন এবং ১০ বছর সাজা ভোগ করেন। কারাভোগ শেষে ভারতে অবস্থান করেই মিরপুরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে তখন পুলিশ জানিয়েছিল।

বাংলাদেশে ফিরে ২০২১ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্ত হয়ে মামুন আবার বিদেশে চলে যান বলে পুলিশ সূত্রের দাবি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তাঁর প্রভাব বেড়েছে বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।

মামুনের একটি বিদেশি মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর ভাই মশিউর রহমান জমি দখল, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জমি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ-বিপক্ষ থাকে এবং কেউ বৈধ নথিপত্র নিয়ে এলে তাঁরা সহায়তা করেন।

একাধিক জমি দখলের অভিযোগ

পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা হাউজিং ও বাউনিয়া এলাকায় জমি কেনাবেচা এবং আবাসন ব্যবসা বেশি। এসব এলাকায় ছোট-বড় শতাধিক আবাসন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এসব এলাকায় অন্তত সাতটি জমি দখলের ঘটনার সঙ্গে মামুন বাহিনীর নাম পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। সাগুফতা হাউজিং এলাকায় ছয় বছর আগে পাঁচ কাঠা জমি কিনে টিনের ঘর নির্মাণ করেছিলেন ১৮টি পরিবার। কয়েকটি পরিবার সেখানে বসবাস করছিল। পরিবারগুলোর অভিযোগ, চাঁদা না দেওয়ায় ২৯ জুলাই রাতে মামুন বাহিনীর সদস্যরা এক্সক্যাভেটর দিয়ে তাঁদের ঘরগুলো গুঁড়িয়ে দেন।

ওই ১৮ পরিবারের জমির পাশে পাঁচ কাঠার একটি প্লট রয়েছে মো. ইউনুস মিয়ার। তাঁর অভিযোগ, তাঁর জমিসহ মোট ১০ কাঠা জমি দখল করে সেখানে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পোশাক কারখানায় চাঁদাবাজি ও ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

মিরপুর এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ২৩০টি পোশাক কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক কারখানা মামুন বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কারখানা থেকে মাসে ২০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কারখানাগুলোর ঝুট ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে বাহিনীটির বিরুদ্ধে।

ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি একটি পোশাক কারখানার ঝুট বিক্রির ব্যবসা করতেন। ওই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য মামুন বাহিনীর সদস্যরা কারখানাটির সামনে প্রায়ই ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাতেন। পরে তিনি ব্যবসা থেকে সরে যান।

গত বছরের জুলাইয়ে পল্লবীতে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে এ কে বিল্ডার্সের কার্যালয়ে হামলার ঘটনাতেও মামুন বাহিনীর নাম আসে। পুলিশ জানিয়েছিল, হামলাকারীরা চারটি গুলি ছুড়েছিল। পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, এ কে বিল্ডার্সে ফোন করে চাঁদা দাবি করা ব্যক্তি ছিলেন মামুনের ভাই জামিল।

এ কে বিল্ডার্সের চেয়ারম্যান মো. কাইউম আলী খানের ছেলে আমিনুল এহসান জানিয়েছিলেন, চাঁদা না দেওয়ায় তাঁদের প্রতিষ্ঠানে দুই দফা হামলা হয়। হামলার সময় গুলিও চালানো হয় এবং এতে একজন আহত হন।

কিবরিয়া হত্যা মামলায় বাহিনীর সদস্যদের নাম

গত ১৭ নভেম্বর মিরপুরের একটি দোকানে ঢুকে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ মামলায় শুটার হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনকে মামুন বাহিনীর সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তারের অভিযোগ, মামুনের ছোট ভাই মশিউর শুটার ভাড়া করে তাঁর স্বামীকে হত্যা করিয়েছেন। চাঁদাবাজিতে বাধা দেওয়ার কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, মামলার আসামিরা এখন তাঁর পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছেন।

হত্যা মামলাটি বর্তমানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মিরপুর বিভাগ তদন্ত করছে। তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানিয়েছেন, হত্যার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

পল্লবীতে একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয়

পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, মামুন বাহিনীর পাশাপাশি পল্লবীতে কয়েকটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টির নাম ভইরা দে গ্রুপ। এই গ্রুপের নেতা মো. আশিক।

চাঁদাবাজি নিয়ে আশিকের সঙ্গে মামুনের ছোট ভাই মশিউরের বিরোধের সৃষ্টি হয় বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। তাঁদের দুজনের কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

পল্লবী থানা-পুলিশের একটি সূত্র বাহুবলী গ্রুপ নামের আরেকটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই গ্রুপের অস্ত্রসহ মহড়ার ছবি ও ভিডিও দেখা গেছে বলে সূত্রটির দাবি।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৮৯ জন খুন হয়েছেন। একই সময়ে চাঁদাবাজির ঘটনায় ২২৪টি, চুরির ঘটনায় ৫৩০টি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১২৮টি এবং ডাকাতির ঘটনায় আটটি মামলা হয়েছে। তবে সব অপরাধের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা করেন না।

পুলিশের তালিকায় মিরপুরকে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওসমান গণি ৩০ জুলাই বলেন, মিরপুর অঞ্চলের অপরাধ বিশ্লেষণ করে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্রুত এসব অপরাধীকে দমন করা হবে বলেও তিনি জানান।

ওসমান গণি আরও বলেন, বিদেশে থাকা সন্ত্রাসীরা দেশে থাকা অনুসারীদের দিয়ে অপরাধ করাচ্ছেন। তাঁদের কারও বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। প্রয়োজনে বিদেশে থাকা অপরাধীদের ধরতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হবে।

রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধের অভিযোগ

মিরপুরে ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। এ ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতার নাম এসেছে। একই সঙ্গে অপরাধী দল পরিচালনার অভিযোগ থাকা কয়েকজনের বিএনপিতে পদ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক ও যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, দলের পরিচয় ব্যবহার করে অনেকে বিভিন্ন অপরাধ করেন। কেউ দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধ দমনে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, সন্ত্রাসীদের অপরাধলব্ধ অর্থের ভাগ কিছু রাজনৈতিক নেতা-কর্মী পাওয়ায় তাঁরা অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন। এই ব্যবস্থা বন্ধ না হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।