রাজধানীতে জমি দখল, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একের পর এক অপরাধের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলা ও দখলচেষ্টার পর অপরাধ দমনে বড় ধরনের অভিযানের চিন্তাভাবনা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২০০২ সালের অপারেশন ক্লিন হার্টের আদলে অভিযান চালানো হবে কি না, তা নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তবে বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বৈঠক হবে। সম্ভাব্য অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি, কিশোর গ্যাং এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
জমি দখলকে কেন্দ্র করে সক্রিয় অপরাধীচক্র
সাম্প্রতিক সময়ে ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রোপার্টিজ, মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান ও আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ও স্থানীয় অপরাধীচক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রের দাবি, ক্ষমতার পালাবদল হলেও দখলদারি ও আধিপত্য বিস্তারে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করার পুরোনো কৌশল বদলায়নি। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ও পুরোনো বিরোধকে কাজে লাগিয়ে তারা আড়াল থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তথ্য এসেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক হামলা ও সহিংসতার পেছনে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মদদ এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের তথ্য পাওয়া গেছে। সামনে আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এ অবস্থায় যৌথ অভিযানের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্তে যাদের নাম আসছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। পোশাকধারী পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ যৌথভাবে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং তা আরও জোরদার করা হবে। নতুন করে যেসব অপরাধী সক্রিয় হয়ে উঠেছে, তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ চলছে।
সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা বলেন, অপরাধমূলক ঘটনাগুলো কারা এবং কেন ঘটাচ্ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য বের হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সরকারকে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও তিনি মত দেন।
ইসিবির ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইসিবি চত্বরসংলগ্ন নিউ গিনি প্রোপার্টিজে হামলার পেছনে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও প্রতিষ্ঠানটির মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া আগে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আবার জামায়াতে যোগ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিরোধপূর্ণ ওই জমিতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও জুলাই যোদ্ধা সালমান মুক্তাদিরকে একটি টিনশেড কক্ষ ভাড়া দেওয়া হয়েছিল।
জমির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগঘরানার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। শাহাদাত বিদেশে থেকে আন্তর্জাতিক কল ও ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে ক্যাডার পরিচালনা করেন বলে ওই সূত্রের দাবি।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহাদাতের দুই শতাধিক ক্যাডার অস্ত্রসহ সেখানে গিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও স্টুডিও তছনছ করে। এতে নেতৃত্ব দেন শাহাদাতের কথিত শুটার সোহেল। পরে ঘটনাটিকে বিএনপি বা যুবদলের চাঁদাবাজি হিসেবে প্রচারের কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলেও সূত্র জানিয়েছে।
নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, হামলার আগে শাহাদাতের শুটার পরিচয়ে সোহেল তাকে ফোন করে হুমকি দিয়েছিলেন। প্রায় দেড় বছর আগে তিনি সালমান মুক্তাদিরকে জায়গাটি ভাড়া দিয়েছিলেন। পরে এ বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
মিরপুরে তিন ভাইয়ের বাহিনীর অভিযোগ
মিরপুরের বাইগারটেক এলাকায় আবাসন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলীর প্রায় ২৮ কাঠা জমি রয়েছে। জমির চারপাশে সীমানাপ্রাচীর ও পাঁচটি টিনের ঘর ছিল। মোহাম্মদ আলীর অভিযোগ, ৩০ এপ্রিল রাতে একদল সন্ত্রাসী বুলডোজার দিয়ে সীমানাপ্রাচীর ও ঘরগুলো গুঁড়িয়ে জমি দখল করে নেয়। তাঁর দাবি, জমিটির মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
মামুন বাহিনী নামে পরিচিত একটি অপরাধী দলের বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ঝুট ব্যবসা, কেবল টেলিভিশন ও ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ বস্তির ঘর থেকে ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বিদেশে থাকা চার ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে মিরপুরে চারটি অপরাধী দল সক্রিয় রয়েছে। এর একটি মামুন বাহিনী। এ বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মফিজুর রহমান মামুন। তাঁর দুই ভাই জামিল রহমান ও মশিউর রহমান দেশে থেকে বাহিনী পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মিরপুর-১৩, মিরপুর-১৪, ভাষানটেক ও কালশী এলাকায় ইব্রাহিম ওরফে কিলার ইব্রাহিমের অনুসারী, মিরপুর-১, মিরপুর-২ ও মিরপুর-৬ এলাকায় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মিরপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহাদত হোসেনের অনুসারী এবং মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ এলাকার কিছু অংশে মোক্তার ও তাঁর অনুসারীদের তৎপরতার কথা বলা হয়েছে।
মামুন মালয়েশিয়ায় অবস্থান করে পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকায় চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা, জমি দখল ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন বলে পুলিশ সূত্রের দাবি। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা ও অন্যান্য মামলার তথ্যও রয়েছে।
মামুনের ভাই মশিউর রহমান অবশ্য চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, জমি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ-বিপক্ষ থাকে এবং বৈধ নথিপত্র নিয়ে কেউ এলে তাঁরা সহায়তা করেন।
রাড্ডা সেন্টার ও অন্যান্য এলাকায় দখলচেষ্টা
মিরপুরের ১৯৭৪ সাল থেকে পরিচালিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের জমি দখলের পরিকল্পনার অভিযোগও উঠেছে। ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত অর্থাৎ ২৫ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহরে সেখানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সন্ত্রাসী ও স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে সম্পত্তিটি দখলের চেষ্টা করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান ও আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকাতেও দীর্ঘদিন ধরে জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন হাউজিং প্রকল্প, সরকারি খাসজমি ও প্রবাসীদের বিরোধপূর্ণ জমি দখলের ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি মিডিয়া এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও চেকপোস্ট জোরদার করা হয়েছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি শনাক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকদের নিয়েও নজরদারি
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখল, মাদক কারবার ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগও সামনে এসেছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কুমিল্লার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে এসেছে।
এর পর ঢাকায় কয়েকটি হামলা, দখলচেষ্টা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত থেকে পরবর্তী ৪৭ ঘণ্টায় এসব ঘটনার মধ্যে মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রোপার্টিজ এবং মোহাম্মদপুর ও আদাবরের জমি দখলচেষ্টার ঘটনাও রয়েছে।
পুলিশের বিভিন্ন সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, রাজধানীর ৫০ থানা এলাকায় ১৫৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় এবং এসব গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকের সংখ্যা শতাধিক। রাজনৈতিক নেতা, শীর্ষ সন্ত্রাসী, হাউজিং ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরদের আটক করে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধে জড়ালে ছাড় না দেওয়ার বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক করতে বলা হয়েছে।
অপরাধ দমনে দেশব্যাপী তালিকা ও অভিযানের উদ্যোগ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশের সব ইউনিট প্রধানের সঙ্গে বৈঠকে নিরপেক্ষভাবে অপরাধী ও চাঁদাবাজদের তালিকা করে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে থানাগুলোকে ২৪ ঘণ্টা টহল বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক অপারেশন খোন্দকার রফিকুল ইসলামও এলাকায় টহল বাড়ানোর নির্দেশনার কথা জানিয়েছেন।
ভোক্তাঋণ বাড়ছে, বাড়ছে পরিবারের আর্থিক চাপ
চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে দেশে ভোক্তাঋণ বেড়েছে ৫ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। জুন শেষে এ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। মার্চ শেষে ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা।
গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ভোক্তাঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে হয় ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা এবং মার্চে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। নয় মাসে মোট বৃদ্ধি হয়েছে ১৩ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক পরিবার জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় সামলাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করছে। শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনের মতো প্রয়োজনীয় খরচেও ঋণ নেওয়া হচ্ছে। আয় একই হারে না বাড়লে অতিরিক্ত ঋণ ভবিষ্যতে পরিবারের ঋণের বোঝা ও আর্থিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, ভোক্তাঋণের মধ্যে বাড়ি বা ফ্ল্যাট, গাড়ি, ক্রেডিট কার্ড, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনের ঋণ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বাড়ায় অনেক পরিবার দৈনন্দিন প্রয়োজনেও ঋণের ওপর নির্ভর করছে।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসান বলেন, বড় ব্যবসা ও শিল্প খাতে নতুন ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো ছোট ঋণ ও রিটেইল ব্যাংকিংয়ে বেশি নজর দিচ্ছে। বড় করপোরেট ঋণে খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকগুলোর নীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করছে না বলেও তিনি জানান।
ডেঙ্গু ও হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও আটজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২ হাজার ৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ২৩৩ এবং আক্রান্তের সংখ্যা ৭৫ হাজার ৭৩০ জনে দাঁড়িয়েছে।
মৃত আটজনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে তিনজন এবং চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে একজন করে রয়েছেন। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ২৮ দিনে ডেঙ্গুতে ১৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ সময় ২ হাজার ৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছরে মোট ৭০ হাজার ২৫৮ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
একই ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩১০ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত হাম ৯৬ জনের এবং সন্দেহজনক হাম ১ হাজার ২১৪ জনের।
চলতি বছরে হাম ও উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৯৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০১ জন এবং হামের উপসর্গে ৯৯৮ জন মারা গেছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৮৯ হাজার ২৫৫ এবং নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২১ হাজার ৩০৮ জন।
বিদ্যুৎ ও এলএনজি ভর্তুকিতে বাড়ছে ব্যয়ের চাপ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদ্যুৎ ও এলএনজি খাতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি ছাড় করা হয়েছে। দুই খাতে পুরো অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। ফলে অর্থবছরের এক-চতুর্থাংশ সময় শেষ হওয়ার আগেই বরাদ্দের প্রায় ৪৫ শতাংশ ছাড় হয়েছে।
২১ সেপ্টেম্বর আগস্টের বিদ্যুৎ ভর্তুকি বাবদ ৪ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বরের এলএনজি আমদানি ভর্তুকি বাবদ ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়। এর আগে জুলাইয়ে বিদ্যুৎ ভর্তুকি এবং জুলাই-আগস্টের এলএনজি ভর্তুকি বাবদ ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড় করা হয়েছিল।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ ভর্তুকির জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা রাখা হলেও বাস্তব প্রয়োজন বেশি হওয়ায় এ খাতে ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিতে হয়েছিল প্রায় ৪৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
এলএনজি খাতেও বরাদ্দের তুলনায় ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। প্রথম আড়াই মাসেই প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাব। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এলএনজি আমদানির মোট ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি
২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি মাসে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। আগস্টে আমদানি ছিল প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন। ফলে চলতি মাসের ওই সময় পর্যন্ত আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ হাজার টন।
অপারেটরদের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের তুলনায় চলতি মাসে এলপিজি আমদানি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ঝুঁকি বাড়া, পর্যাপ্ত কার্গো ও জাহাজ না পাওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। তবে বাজারে তা ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও বাড়তি দাম দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
অপারেটররা বাজারে এলপিজির সংকট নেই এবং সরবরাহ ও মজুদ স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা চাহিদামতো সরবরাহ না পাওয়াকে বাড়তি দামের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ অপারেটরদের সঙ্গে এলপিজির বাজার, আমদানি ও মজুদ পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জোরালো ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
সংবিধান সংশোধনে ফের গণভোট নিয়ে মতবিরোধ
সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে নতুন করে গণভোট আয়োজনের কথা জানিয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ কয়েকটি দল বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতেই এ বিষয়ে গণভোট হয়েছে।
বিশেষ কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদসহ কিছু জায়গায় সংসদ পরিবর্তন আনলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে গণভোট প্রয়োজন।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান নতুন গণভোটের বিরোধিতা করেছেন। বিশেষ কমিটির সদস্য বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন বলেছেন, বিরোধী দল কমিটিতে অংশ নিলে অনেক বিষয়ে সমাধানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তারা অংশ না নিলে সরকার একতরফাভাবে এগিয়ে যেতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া মনে করেন, আদালত কোনো বিধান পুনর্বহাল করলে তার জন্য নতুন করে সংসদে আইন পাসের প্রয়োজন নেই। ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিকও মনে করেন, উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে গণভোটের বিধান সংবিধানে পুনর্বহাল হয়েছে।
বিশেষ কমিটি জানিয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদে বিল উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। সংসদ বিল অনুমোদন করলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে আবার গণভোটের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
আরও পড়ুন:







