মঙ্গলবার

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩

সংবিধান সংশোধনে ফের গণভোট, প্রশ্ন বিরোধীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:৪০

শেয়ার

সংবিধান সংশোধনে ফের গণভোট, প্রশ্ন বিরোধীদের
ছবি সংগৃহীত

সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে আবারও গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। তবে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বলছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটেই জনগণ সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে মতামত দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, নতুন গণভোটের মাধ্যমে আগের গণভোটের রায়কে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, প্রস্তাবিত গণভোটটি হবে সাংবিধানিক গণভোট। সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদসহ কিছু বিধানে সংসদ পরিবর্তন আনলে তা গণভোটে দেওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে তিনি জানান।

নতুন গণভোট নিয়ে সরকারের অবস্থান

গত রবিবার কমিটির বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সংসদ সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় পরিবর্তন আনলে সেগুলো গণভোটে দিতে হবে। এ কারণেই নতুন সাংবিধানিক গণভোটের প্রয়োজন হবে বলে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

কমিটির সদস্য বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন বলেন, বিরোধী দল কমিটির কার্যক্রমে অংশ নিলে অনেক বিষয়ে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে তারা অংশ না নিলে সরকারকে একতরফাভাবে এগোতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে গণভোট আয়োজন করা হতে পারে।

আগের গণভোটের রায়ের মূল্য নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হলে সেটি আলাদা কোনো গণভোট হিসেবে বিবেচিত হয় না। তাঁর মতে, গণভোট নির্দিষ্ট একটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই অনুষ্ঠিত হয়।

গণভোটের বিধান পুনর্বহাল নিয়ে আইনজীবীদের মতভেদ

বিশেষ কমিটির সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ কর্মী ও সাংবাদিক নেতাদের গত রবিবারের মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই বিধান বাদ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর উচ্চ আদালতের আদেশে তা পুনর্বহাল হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের বিধান সংবিধানে ফিরে আসায় এখন সাংবিধানিক গণভোট করতে হবে।

তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। তাঁর মতে, আদালত কোনো বিধান পুনর্বহাল করলে সেটির জন্য আবার সংসদে আইন পাসের প্রয়োজন হয় না। অষ্টম সংশোধনী মামলার রায়ের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মামলার রায়েও গণভোটের ব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহাল হয়েছে। ফলে ওই দৃষ্টান্ত অনুযায়ী নতুন করে সংসদের আইন প্রণয়নের প্রয়োজন নেই।

ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিকও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে গণভোটের বিধান সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে। তবে সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৮, ৪৮, ৫৬ বা ১৪২ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সরকার গণভোট আয়োজন করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ১৪২ অনুচ্ছেদ নিয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি। ওই রায় প্রকাশের পর বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

জুলাই জাতীয় সনদ ও আগের গণভোট

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রায় এক বছর সংলাপ করে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করে। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর দলগুলো সনদে স্বাক্ষর করে। পরে ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ জারি হয়।

ওই আদেশে জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট আয়োজনের কথা বলা হয়েছিল। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে চলতি সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবে এবং সংসদ সদস্যরা পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে সংবিধানের নির্দিষ্ট মৌলিক সংস্কার করবেন বলে সেখানে বলা হয়।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোটেও হ্যাঁ জয়ী হয়। নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। তবে ক্ষমতাসীন দল ওই আদেশকে অসাংবিধানিক দাবি করে সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর সংসদ সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেন এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন।

বিশেষ কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের আইনগত অবস্থান জানতে চাওয়া হলে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, গণভোটের অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরিত হয়নি। তবে কমিটি গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদকে ধারণ করে বলে জানানো হয়।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আইনি পরামর্শক তানিম হোসেন শাওন বলেন, ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে সম্মতি দিয়েছে। তাঁর মতে, ওই গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কার করাই আইনসিদ্ধ ও সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য পথ।

বিরোধীদের আপত্তি ও নতুন গণভোটের আশঙ্কা

জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাজিবুর রহমানের অভিযোগ, জনগণের দেওয়া জনরায় সরকার আমলে নিতে চাইছে না। নতুন গণভোট আয়োজনের মাধ্যমে আগের গণভোটের রায়কে বাতিল করার চেষ্টা চলছে বলে তিনি মনে করেন।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুমের অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভ্যুত্থান, ঐকমত্য, কমিশন, জনগণের ম্যান্ডেট ও গণভোটকে বাদ দিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির পরের সময় থেকে বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তাঁর মতে, ১৯৭২ সালের সংবিধানের অধীনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং এতে পুরো সংস্কারপ্রক্রিয়া ও অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য ও দলটির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, তাদের দল বর্তমান প্রক্রিয়াকে প্রহসনমূলক ও একদলীয় মনে করে। তাঁর অভিযোগ, গণভোটের গণরায় উপেক্ষা করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

বিরোধী দলগুলোর আশঙ্কা, সরকার জুলাই জাতীয় সনদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিবর্তন করে নিজেদের মতো সংবিধান সংশোধন বিল আনতে পারে। এরপর নতুন গণভোটের মাধ্যমে পরিবর্তিত বিষয়গুলো অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে বলেও তারা মনে করছে।

নতুন গণভোটের পক্ষে মত

সরকারপন্থী কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারা অবশ্য নতুন গণভোটের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল বলেন, যেকোনো মৌলিক সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে গণভোটের প্রয়োজন হতো না। যেহেতু তা ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয়নি, তাই গণভোটের প্রয়োজন রয়েছে।

সংস্কার প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বিশেষ কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে আইন মন্ত্রণালয় আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন করতে পারে।

সংসদে বিল অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে আবার গণভোট আয়োজন করা হবে বলে বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।