মঙ্গলবার

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩

বাড়ছে ধর্ষণ মামলা, তদন্তে মিলছে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:১৬

শেয়ার

বাড়ছে ধর্ষণ মামলা, তদন্তে মিলছে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

দেশজুড়ে ধর্ষণের ঘটনা ও মামলা বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিভিন্ন থানায় ধর্ষণের অভিযোগে ৪ হাজার ৬৫৪টি মামলা রেকর্ড হয়েছে, যা কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পুলিশের একাধিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

পুলিশের উচ্চপর্যায়ে ধর্ষণ মামলা বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব মামলা ভালোভাবে তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুলিশের সব ইউনিটকে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৩ হাজার ২৫২টি। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ১ হাজার ৩১২টি এবং মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৯৪০টি মামলা হয়েছে। জুলাইয়ে ৭০৭টি এবং আগস্টে ৬৯৫টি মামলা রেকর্ড হয়েছে।

গত বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ধর্ষণের মামলা হয়েছিল ১ হাজার ৫২৮টি। চলতি বছরের একই সময়ে মামলা হয়েছে ৪১২টি বেশি। জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় মার্চ-জুন সময়ে মামলা বেড়েছে ৬২৮টি।

মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ মামলা হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানায়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৬৪টি, গোপালগঞ্জে ৬২, কক্সবাজারে ৬২, ঢাকা জেলায় ৫৮, টাঙ্গাইলে ৫৭, কুমিল্লায় ৫৩, চট্টগ্রাম জেলায় ৫০ এবং বগুড়ায় ৪৭টি মামলা হয়েছে।

সম্প্রতি পুলিশের উচ্চপর্যায়ের এক সভায় ধর্ষণ মামলা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি ধর্ষণ মামলাগুলো ভালোভাবে তদন্তের পাশাপাশি দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য পুলিশের সব ইউনিটকে নির্দেশ দেন।

মামলা বাড়ার কারণ নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহ্মদ সম্প্রতি ধর্ষণের মামলা তুলনামূলক বেশি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, আগে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন হস্তক্ষেপের কারণে ভুক্তভোগীরা থানায় মামলা করতে যেতেন না বা যেতে পারতেন না। এখন থানায় গেলেই এফআইআর করা যাচ্ছে। কোনো হস্তক্ষেপ না থাকায় মামলার সংখ্যা বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার, চার্জশিট ও সাক্ষী উপস্থাপনসহ বিচারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। পল্লবীতে শিশু হত্যার বিচার ১৫ থেকে ১৭ দিনের মধ্যে হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পুলিশের মুখপাত্র এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, বর্তমানে অপরাধ যারাই করুক, তা ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ নেই। মামলা গ্রহণে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা অন্য চাপ না থাকায় এবং ভুক্তভোগীরা নির্বিঘ্নে থানায় অভিযোগ করতে পারায় প্রকৃত ঘটনার একটি বড় অংশ এখন মামলা হিসেবে রেকর্ড হচ্ছে। এটিও ধর্ষণ মামলার পরিসংখ্যান বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে।

তিনি বলেন, ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

তদন্তে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ

ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের কয়েকটি মামলায় অভিযুক্তদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। গত ৪ আগস্ট ধর্ষণের অভিযোগে যশোরের চৌগাছা সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরাফাত হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গত ৩ জুন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে ছাত্রদল নেতা হোসাইন আহমদকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৯ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যায় কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ইসমাইলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গত ২৬ আগস্ট নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পৌর বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বকুলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ১৬ মার্চ কিশোরীর শ্লীলতাহানির অভিযোগে বিএনপি নেতা শক্র মাঝিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ছাড়া ৪ আগস্ট নওগাঁর বদলগাছীতে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে জামায়াত নেতা শফিউল হাসানের বিরুদ্ধে। ১৭ জুলাই পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে তাবিজ দেওয়ার কথা বলে এক নারীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে স্থানীয় জামায়াত নেতা মোস্তাফিজুর রহমান মাহবুবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ঢাকা বিভাগের দুটি জেলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই পুলিশ সুপার বলেন, ধর্ষণের যেসব অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তদন্তে অধিকাংশ ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের নাম পাওয়া যাচ্ছে। তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে এক শ্রেণির ব্যক্তি এ ধরনের অপরাধ করছে।

অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে সামাজিক অস্থিরতার কথাও বলছেন বিশ্লেষক

অপরাধ বিশ্লেষক ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, পরিসংখ্যানগতভাবে ধর্ষণের মামলা বাড়ছে। মামলা বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য আংশিক সত্য হলেও পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে এক শ্রেণির দুর্বৃত্ত ধর্ষণের মতো অপরাধ করছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকায় কিছুটা নমনীয়তা রয়েছে।

তার মতে, প্রযুক্তির অবাধ বিস্তারের সঙ্গে প্রযুক্তিগত অপশিক্ষাও ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির একটি কারণ। পাশাপাশি সম্পত্তিগত শত্রুতা, প্রতিশোধ নেওয়ার মনোভাব ও অস্থিতিশীল সামাজিক পরিবেশও এ ধরনের অপরাধের পেছনে ভূমিকা রাখছে। ধর্ষণের ঘটনার নির্মোহ তদন্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের আগেই কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

আলোচিত কয়েকটি ঘটনা

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশজুড়ে বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা আলোচনায় আসে। এর মধ্যে ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা (৭) ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়। ২১ মে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের শিশু ফারিয়াকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।

৯ সেপ্টেম্বর পাবনায় চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। পরে তার লাশ টুকরা টুকরা করে ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদীতে মাদরাসাছাত্রী জামিলা খাতুনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। বাধা দিতে গেলে তার নানি সুফিয়া খাতুনকেও হত্যা করা হয়।

২৪ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে দুই সন্তানের জননী ধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনার পর ওই নারী আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।