রবিবার

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২ আশ্বিন, ১৪৩৩

ইউনাইটেড গ্রুপের গ্যাস বিলে ৯৮১ কোটি টাকার হেরফের: দুদকের অনুসন্ধান

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:৪১

আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:৪২

শেয়ার

ইউনাইটেড গ্রুপের গ্যাস বিলে ৯৮১ কোটি টাকার হেরফের: দুদকের অনুসন্ধান
ছবি সংগৃহীত

বছরের পর বছর গ্যাস ব্যবহার। অথচ, বিল পরিশোধে শত শত কোটি টাকার হেরফের। এবার ইউনাইটেড গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে সেই হিসাবেরই প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক।

প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গ্যাস বিল বাবদ প্রায় ৯৮১ কোটি ৬৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগ উঠেছে। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলে আদালতে দাখিল করা অনুসন্ধান অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধানে প্রাথমিক সত্যতা

দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ক্যাপাসিটি রেটের পরিবর্তে বেআইনিভাবে আইপিপি রেটের সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে গ্যাস বিল পরিশোধে এই অনিয়ম করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। দুদকের পক্ষ থেকে, আদালতে দাখিল করা অনুসন্ধান অগ্রগতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন—বিইআরসি, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এবং কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর থেকে নথি ও তথ্য সংগ্রহ করে দুদক। এ সময় এসব নথি পর্যালোচনার পর ইউনাইটেড পাওয়ারের গ্যাস বিল সংক্রান্ত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

বকেয়ার পরিমাণ

দুদকের তথ্যমতে, তিতাস গ্যাসের ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ইউনাইটেড পাওয়ার ৪৮৬ কোটি ৪৩ লাখ ৮২ হাজার ৬১১ টাকা ৭৫ পয়সা পরিশোধ করেনি। অন্যদিকে, কর্ণফুলী গ্যাসের ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৪৯৫ কোটি ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৪০৪ টাকা পরিশোধ করা হয়নি বলেও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। দুই গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানে ইউনাইটেড গ্রুপের মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে—৯৮১ কোটি ৬৭ লাখ ৮০ হাজার ১৫ টাকা ৭৫ পয়সা।

অন্যান্য অভিযোগও অনুসন্ধানাধীন

তবে, এই অনুসন্ধান শুধু শত কোটি টাকার কারসাজির অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন উদ্দিন হাসান রশিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ একত্রে অনুসন্ধান করা হচ্ছে বলে আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়।

এর মধ্যে রয়েছে—জাল দলিলের মাধ্যমে সরকারি অর্পিত সম্পত্তি দখল, অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থ পাচার এবং গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে অনিয়ম। আর সেই অনুসন্ধানেই গ্যাস বিলের ক্ষেত্রে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বকেয়ার তথ্য সামনে আসে।

ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে দুদকে সরেজমিনে উপস্থিত হয় টিম বাংলা এডিশন। সেখানে ইউনাইটেড গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান এখনো চলমান রয়েছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট মহল।

আওয়ামী লীগের দোসরের পুনর্বাসন

এছাড়াও, স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ আমলা এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরীকে ইউনাইটেড গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে পুনর্বাসন করা হয়েছে বলে তথ্য রয়েছে। এমনকি এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের সভা-সমাবেশ আয়োজনের জন্য শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) নিষিদ্ধ দলটিকে ২০ লাখ টাকা ফান্ডিং করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।

পুরোনো বিতর্ক

তবে, ইউনাইটেড গ্রুপকে ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত আরও বহু পুরোনো। এর আগেও প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা সময়ে। কিছুদিন পূর্বে ইউনাইটেড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অধ্যাপক ডা. মহসিন আহমেদের নিয়োগ নিয়েও তৈরি হয় ব্যাপক বিতর্ক।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর করা বেশ কয়েকটি পোস্টকে কেন্দ্র করে সে সময়ে জন্ম নেয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। যেসব পোস্টে ডা. মহসিন আহমেদকে জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে দেখা যায়। একই সময়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স না দেয়ার অভিযোগও উঠেছিল ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে।

সেই সঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান আব্দুল মুবিনকে অবসরের পর ইউনাইটেড পাওয়ারের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া এবং জুলাই-পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুরে তাকে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেয়ার অভিযোগও সামনে আসে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। একইভাবে, ১/১১-এর সময়ের বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ থাকা সাবেক ডিজিএফআই কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল আফজাল নাসিরকেও ইউনাইটেড গ্রুপে চাকরি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ফলে, একের পর এক অভিযোগ আর বিতর্কের মধ্যেই এবার সামনে এলো গ্যাস বিলের প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য। বিদ্যুতের আলো জ্বালানোর আড়ালে যদি জমতে থাকে অন্ধকারের হিসাব—তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কার সিদ্ধান্তে, কোন প্রক্রিয়ায় ৯৮১ কোটি টাকার হেরফের হলো?

সবমিলিয়ে ইউনাইটেড গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত যেমন জরুরি, তেমনই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়াও সময়ের দাবি বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।