রবিবার

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২ আশ্বিন, ১৪৩৩

জুলাই সনদে ভিন্নমত, প্রাধান্য পাবে নির্বাচনি ইশতেহার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৪৩

শেয়ার

জুলাই সনদে ভিন্নমত, প্রাধান্য পাবে নির্বাচনি ইশতেহার
ছবি সংগৃহীত

গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ, ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ও দলটির ৩১ দফার আলোকে সংবিধানে ১৮তম সংশোধনী আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে বিএনপিসহ মিত্র দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহার প্রাধান্য পাবে।

ফলে সম্ভাব্য এই সংশোধনীর সঙ্গে সরাসরি গণভোটের রায়ের কোনো সম্পর্ক থাকছে না। গণভোটকে ইতিমধ্যে মহাপ্রতারণা ও সংবিধান পরিপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সরকারি দল বিএনপি।

ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্য

ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি কাজের গতি বাড়িয়েছে। গত ১৩ জুলাই গঠিত এই কমিটির প্রথম বৈঠক হয় ৪ আগস্ট। দীর্ঘ বিরতির পর দ্বিতীয় বৈঠক হয় রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর)। এরপর আজ রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) আবার বৈঠকে বসছে কমিটি।

৪ আগস্টের প্রথম বৈঠকেই রাজনৈতিক দল, সংবিধানবিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেয় বিশেষ কমিটি। ২০ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হয়। আজকের বৈঠকে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মতামত নেওয়ার কথা রয়েছে।

ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ইতিমধ্যে প্রতিবেদন তৈরির কাজও শুরু করেছে বিশেষ কমিটি। ওই সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়া হলে আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদের শীতকালীন ও ইংরেজি নতুন বছর ২০২৭-এর প্রথম অধিবেশনেই সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল আসতে পারে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিশেষ কমিটির অবস্থান

২০ সেপ্টেম্বরের বৈঠক শেষে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তাঁরা দ্রুত গতিতে এগোতে চান এবং সম্ভব হলে প্রতি সপ্তাহে একটি করে বৈঠক আয়োজন করবেন।

তিনি বলেন, জুলাই সনদ নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করা হবে। জুলাই জাতীয় সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ কমিটি সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার পর আইন মন্ত্রণালয় সেটি বিল আকারে সংসদে আনবে।

রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের লক্ষ্যে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়েছিল। সে সময় সংবিধানবিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও আলোচনা হয়। বাম ধারার চারটি দল সনদে সই করেনি। সব মিলিয়ে ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোট সনদে স্বাক্ষর করে।

জুলাই সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধানসংক্রান্ত। এগুলো বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছিল। সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এসব সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়।

গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় ওই আদেশ অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারকাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে নির্বাচন শেষে সরকার গঠনের পর এই সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। বিএনপি জোটের সদস্যরাও সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

ভিন্নমতের ক্ষেত্রে ইশতেহারকে প্রাধান্য

জুলাই সনদে থাকা সংবিধানসংক্রান্ত সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ৪৮টি প্রস্তাবের মধ্যে অনেক বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদে তাঁরা একমত হয়েছেন এবং সেগুলো নেওয়া হবে। যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া হয়েছে, সেগুলো নোট অব ডিসেন্ট হিসেবেই নেওয়া হবে। এর বাইরে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে থাকা বিষয়গুলোও ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি।

জুলাই সনদের মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে বিশেষ কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই সনদেই এর ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। কোনো বিষয়ে বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে থাকলে এবং সেই দ্বিমতের আলোকে তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলে সেটিই প্রিভেইল করবে। তাঁর মতে, সেটিও জুলাই সনদের অংশ।

গণভোটে যে চার বিষয়ে মত নেওয়া হয়েছিল

এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে পৃথক রঙিন ব্যালটে চারটি বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। একটি প্রশ্নের মাধ্যমে ভোটারদের হ্যাঁ বা না ভোটে মতামত নেওয়া হয়।

গণভোটের প্রশ্নে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর প্রতি সম্মতি জানতে চাওয়া হয়।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় গঠন; আগামী সংসদ দুই কক্ষবিশিষ্ট করা; জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন এবং সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন নেওয়া।

এ ছাড়া সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হওয়া ৩০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলোর বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়। জুলাই সনদে থাকা অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়নের বিষয়টিও প্রস্তাবে ছিল।

বাস্তবায়ন আদেশে সংস্কার পরিষদের বিধান

গত বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর গেজেট জারি হয়। ওই আদেশের ৭ ধারায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, এর কার্যাবলি ও বিলুপ্তির কথা বলা হয়।

আদেশে বলা হয়, পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।

তবে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১০০ সদস্য নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে অনেক দল একমত। এটি সরাসরি জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে না। সংসদে প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনদের নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। তবে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা উচ্চকক্ষের থাকবে না।