বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এক নতুন রূপ। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দিনের সফর। আর সেই সফরে কূটনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সামনে এসেছে একের পর এক চমক।
জাতিসংঘে যাত্রা ও ভাষণ
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরবর্তীতে স্থানীয় সময় সূত্রে, শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ভোর ৪টার দিকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।
বক্তব্যের শুরুতেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল শহীদের ত্যাগ ও বিসর্জনকে স্মরণ করে, পতিত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের গত ১৭ বছরের গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি আর টাকা পাচারের কথা বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন তারেক রহমান।
সেই সঙ্গে সংঘাত নিরসনে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন তিনি। পাশাপাশি বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক মঞ্চে ফিলিস্তিনের বাস্তুহারা মানুষের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
এ সময় তাঁর সহধর্মিণী জুবায়দা রহমান ও তাঁর কন্যা জায়েমা রহমানও অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন।
দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক বৈঠক
শুধু সাধারণ পরিষদের মঞ্চেই নয়, সফরের প্রতিটি মুহূর্তেই ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে নানা কূটনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক।
এ সময় মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিক বৈঠকের খবর সামনে আসে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রসঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বাড়ানোর কথা তুলে ধরা হয়।
ঠিক তার পরপরই, বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ধারাবাহিক কূটনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গেও বৈঠকে বসেন তারেক রহমান। দুই বৈঠকেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থনীতি ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও তারেক রহমানের বৈঠক ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক সমীকরণ। কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বিনিয়োগের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয় বলে তথ্য পাওয়া যায়।
এ ছাড়াও মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপ, শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারসহ জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তারেক রহমান বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম ও জলবায়ু সহনশীলতার বিষয় নানা দিক তুলে ধরা হয়।
একইভাবে, ভুটান ও মালদ্বীপের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার কথা সামনে আসে।
বিমান চুক্তি ও অন্যান্য আলোচনা
সফরে বিমান পরিবহন খাতে আসে বড় চমক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক, গেটস ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গেও আলোচনার তথ্য উঠে আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
প্রধানমন্ত্রীর এই ব্যস্ত সফরের অন্যতম অংশ ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী জুবায়দা রহমান। প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি তাঁর সহধর্মিণীও নারীর নেতৃত্ব, স্বাস্থ্য এবং মাতৃ ও নবজাতকের সেবাসহ আটটি উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নেন বলে জানা গেছে।
সফরের সমাপ্তি
সবমিলিয়ে, চার দিনের এই সফরে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা প্রায় ৮০টি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এরইমাঝে, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে নিউইয়র্ক ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তথ্য মতে, শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এমিরেটসের ফ্লাইটে দুবাই হয়ে ঢাকার পথে যাত্রা করেন তিনি। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকায় পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা, আর বৈঠকের টেবিলে জাতীয় স্বার্থের নানা সমীকরণ—পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফরে কূটনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একাধিক দরজা খোলার চেষ্টা। এখন সেই আলোচনার বাস্তব প্রতিফলনের অপেক্ষা বাংলাদেশের।
আরও পড়ুন:







