রাজধানীতে সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের পর অর্থদাতা ও সমন্বয়কারীদের শনাক্তে তৎপরতা শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ডিভাইস ফরেনসিক করে কয়েকজন অর্থদাতার নাম পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাদের মধ্যে রাজধানীতে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন নেতার নামও এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রের দাবি, গত ১৮, ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় অন্তত ১২টি স্থানে ৩২টি ককটেল বিস্ফোরণ এবং কয়েকটি বাসে অগ্নিসংযোগ ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা হয়। কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রেনেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ঘটনায় অর্থের বিনিময়ে হামলা চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে। বিদেশি নম্বর থেকে লোকেশন ও টার্গেট নির্ধারণ করে নির্দেশনা দেওয়া হলেও দেশের কিছু ব্যক্তি এসব কর্মকাণ্ডে সমন্বয় করছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
নাশকতার ঘটনায় নতুন তালিকা
নাশকতা ঠেকাতে অর্থদাতা ও সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতোমধ্যে বেশ কিছু নাম ডিবির বিভিন্ন বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি বিভাগে ১০ থেকে ১২ জন অর্থদাতার নামের তালিকা দেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তালিকা হলে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
প্রাথমিক তালিকার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট টিম অভিযান চালাচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে অর্থদাতাদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে লুটপাট ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া কয়েকজন ব্যক্তি বিদেশে অবস্থান করে নাশকতায় অর্থ জোগানোর চেষ্টা করছেন। বিদেশে থাকা দলটির শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতা ঢাকায় আত্মগোপনে থেকে নিজেদের অনুসারীদের মাধ্যমে নাশকতা পরিচালনা করছেন বলেও সূত্রটির দাবি।
নতুন করে নাশকতা ঘটাতে ঢাকার বাইরের মহানগর ও থানা পর্যায়ের নেতাদেরও কাজে লাগানো হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ কারণে এখনো পলাতক আওয়ামী লীগের এমপি ও ঢাকার আশপাশের শীর্ষ নেতাদের নামও অর্থদাতা ও নাশকতার নেতৃত্বদানকারীদের তালিকায় রাখা হয়েছে।
রাজধানীর যেসব এলাকায় হামলা
সূত্র জানায়, ১৮, ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ফটকের সামনে, শিল্পকলা একাডেমি, যাত্রাবাড়ী থানার সামনে, মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, নিউমার্কেট, বাবুবাজার, কমলাপুর স্টেশন, মগবাজার, মৎস্য ভবন মোড় ও রামপুরায় বিটিভি ভবনের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে।
এ ছাড়া কাফরুল থানার সামনে, মিরপুর-১১, মিরপুর-১, মধ্য বাড্ডা, পল্লবী ও আজিমপুরে ছয়টি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা হয়। কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রেনেও আগুন দেওয়া হয়।
কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি, তিন শতাধিক চেকপোস্ট, পেট্রোলিংসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পরও এসব হামলা ঠেকাতে না পারায় হামলাকারীদের পাশাপাশি অর্থদাতাদের গ্রেপ্তারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
গোয়েন্দা নজরদারিতে যেসব নেতা
একাধিক সূত্রের দাবি, ঢাকায় আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা বিদেশে থাকা ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নসরুল হামিদ বিপু, জাহাঙ্গীর আলম, নিক্সন চৌধুরী, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
সূত্রের ভাষ্য, বিদেশ থেকে নির্দেশনা এলেও দেশে থাকা মহানগরের নেতা, সাবেক এমপি ও সাবেক কাউন্সিলররা হামলাকারীদের সঙ্গে সমন্বয় করছেন। অর্থের পাশাপাশি হামলাকারীদের বিভিন্ন কমিটিতে প্রত্যাশিত পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ পুনর্গঠন ও নাশকতার সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা এমন অর্ধশত নেতা গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভিডিও পাঠালেই মিলছে প্রতিশ্রুত টাকা
গত ১৮ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পাঁচটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় একটি মোটরসাইকেলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। পুলিশ জানায়, বংশাল থানাধীন ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক মো. রায়হান উদ্দিন এ হামলার নেতৃত্ব দেন। পাঁচ মাস জেল খেটে বের হওয়ার পর প্রতি ককটেল ৫ হাজার টাকা করে চুক্তিতে সহযোগীদের নিয়ে তিনি পাঁচটি বিস্ফোরণ ঘটান বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
একটি ভারতীয় নম্বর থেকে তাকে ককটেল বিস্ফোরণের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। ওই নম্বর থেকে নির্দেশদাতা হিসেবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সাব্বির হোসেনের নাম এসেছে।
ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেওয়ার সমন্বয়ের অভিযোগে ২১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার থেকে সবুজ নামে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করে ডেমরা থানা পুলিশ। ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরে পার্কিং করা একটি বাসে অগ্নিসংযোগের চেষ্টার সময় আমিনুল ইসলাম শাওন নামে এক যুবলীগকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গতকাল ভোরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে অভিযান চালিয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য ও ককটেল তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং অসৎ উদ্দেশ্যে তৈরি ৯ হাজার কাগজের মুখোশ উদ্ধারসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে শ্যামপুর মডেল থানা পুলিশ।
এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও ডিভাইস ফরেনসিক করে অর্থদাতাদের নাম পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সুপ্রিম কোর্টের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ
১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে গিয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ২০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে সালমান ইসলাম সাকিব ওরফে আসিফ (২৩) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।
পুলিশ জানায়, তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের মতিঝিল থানা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসিফ জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থান হওয়ায় তাকে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। একটি বিদেশি নম্বর থেকে সময় ও লোকেশন জানানো হয়। তাকে নির্দেশনা দেন মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মিরাজ বিশ্বাস। পটপরিবর্তনের পর মিরাজ বিশ্বাস বিদেশে পালিয়ে যান বলে জানা গেছে।
গত মঙ্গলবার গুলশানের একটি বাসা থেকে চট্টগ্রাম-৩ আসনের সাবেক এমপি মো. মাহফুজুর রহমান মিতাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। সূত্রের দাবি, আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তিনি আওয়ামী লীগ পুনর্গঠন ও নাশকতায় অর্থদাতা হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে নাশকতার জন্য বিদেশে বসে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান দুই ডজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও সক্রিয় এবং বিভিন্নভাবে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছেন বলে সূত্রটির দাবি।
আত্মগোপনে থেকেও যোগাযোগ
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের পতনের পর দলের শীর্ষ নেতা থেকে তৃণমূলের কর্মীরা আত্মগোপনে গেলেও তাদের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়নি। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী ঢাকার অপরাধপ্রবণ এলাকা ও বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কেউ ছদ্মবেশে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় আত্মগোপন করে রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখছেন।
তারা টেলিগ্রাম, ফেসবুক ও বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে শেখ হাসিনার বার্তা নেতা-কর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি ডিসেম্বরকে লক্ষ্য করে নেতা-কর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
নাশকতার আশঙ্কার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞ
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার ঘোষণাটি মূলত রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং নেতা-কর্মীদের চাঙা রাখার কৌশল। এরপরও নাশকতার ঘটনা আরও ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক নাশকতার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থদাতাদের কিছু নাম পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত আছে। অর্থদাতা হিসেবে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে, তাদেরই আইনের আওতায় আনা হবে।
আরও পড়ুন:







