বাংলা টিভির সাংবাদিক প্রান্ত পারভেজের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ; তবে অস্বীকার পারভেজের।
সম্প্রতি গণ্যমাধ্যমে প্রচারিত একটি চাঞ্চল্যকর সংবাদ ঘিরে চারদিকে শুরু হয় তুমুল তোলপাড়। সেসব সংবাদে বলা হয়, ৭১ টিভিতে সন্ত্রাসী গ্যাংদের বিরুদ্ধে একটি সংবাদ প্রকাশের পর, মিরপুরে এক সাংবাদিকের বাসায় গুলি চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা।
এই খবরের সূত্র ধরেই আসল সত্য উদঘাটনে মাঠে নামে ‘টিম বাংলা এডিশন’।
বাসায় হামলা ও গুলির ঘটনা
ঘটনার সূত্রপাত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত ঠিক দেড়টায়। পল্লবীর সবুজ বাংলা এলাকায় বাংলা টিভির সাংবাদিক প্রান্ত পারভেজের বাসায় দুটি মোটরসাইকেলে এসে আকস্মিক হামলা চালায় চার সশস্ত্র সন্ত্রাসী।
গুলির শব্দে যখন চারপাশ প্রকম্পিত, তখন এই সাংবাদিক টয়লেটে লুকিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচান বলে দাবি করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর ও পল্লবী এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আতঙ্কে এলাকাবাসী, তারাই তার বাসায় এই প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে।
হামলার পরপরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। আর ছায়া তদন্তে নামে এসআরবি-৪’র বাহিনী। সাংবাদিকের বাসায় হামলা ও গুলির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে, আতিক ওরফে ‘চোরা আতিক’কে গ্রেপ্তার করার বিষয়ে সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলন করেছে এসআরবি।
ওই সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী সাংবাদিক, প্রান্ত পারভেজ, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
আসল পরিচয় উন্মোচন
কিন্তু যাকে ‘ভুক্তভোগী সাংবাদিক’ বলা হচ্ছে, সেই প্রান্তর আসল পরিচয় খুঁজতে গিয়েই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানে।
রাজধানীর পল্লবীর সবুজ বাংলা এলাকায় সাংবাদিক প্রান্ত পারভেজের বাসায় সরেজমিনে যায় ‘টিম বাংলা এডিশন’। তবে, এ সময় তাকে বাসায় পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ক্যামেরার সামনে কথা বলেন তার স্ত্রী এবং তুলে ধরেন চাঞ্চল্যকর কিছু অভিযোগ। প্রান্ত পারভেজের স্ত্রী দাবি করেন, কিশোর গ্যাং নেতাদের সাথে প্রান্ত পারভেজের দীর্ঘদিনের শত্রুতা রয়েছে।
এ ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে সাংবাদিক প্রান্ত পারভেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন। পরিবারের অভিযোগ, এরপর থেকেই নতুন করে প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছেন তিনি।
কলঙ্কিত অতীত
অনুসন্ধানে, উন্মোচিত হয় সাংবাদিক পারভেজের কলঙ্কিত অতীত। জানা যায়, তার আসল নাম পারভেজ, পরে নামের আগে ‘প্রান্ত’ যোগ করেন। তার উত্থানের গল্প হলিউডের সিনেমাকেও হার মানায়। মিরপুরের কিছু চিহ্নিত ভুয়া সাংবাদিকের হাত ধরে, একটি জাতীয় দৈনিকের আদলে ‘জনতার আলো’ নামের একটি অনলাইন পোর্টাল খুলে বসেন প্রান্ত। ওই পোর্টালের আড়ালে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ উঠেছে প্রান্তের বিরুদ্ধে। জানা যায়, পরে বাংলা টিভির এক সাংবাদিকের মাধ্যমে, মূলধারার গণমাধ্যমে ঢোকেন প্রান্ত।
তবে তার আগে, ‘জনতার আলো’ পোর্টালে সারা দেশে জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগের নামে, বিশাল চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া, প্রান্তের বিরুদ্ধে সংবাদের নামে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর থেকেও, টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একইভাবে, বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে আঁতাত রয়েছে প্রান্তের, স্থানীয় ওই সাংবাদিক জানান এমনটাও।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পারিবারিক অভিযোগ
অন্যদিকে, প্রান্তর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও পাওয়া গেছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। প্রান্ত নিজেকে এইচএসসি পাস দাবি করলেও, প্রান্ত’র বাবা বাংলা এডিশনকে জানিয়েছেন, তার ছেলে স্কুলের গণ্ডিই পেরোয়নি। পাস করেননি এসএসসিতে।
সন্তান হয়েও বাবা-মায়ের কোনো ভরণপোষণ দেন না পারভেজ। বাংলা এডিশনের কাছে এমন অভিযোগ করেন তার বাবা।
রাজনৈতিক সংযোগ ও চাঁদাবাজি
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক ফ্যাসিস্ট সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে সক্ষতা গড়ে তুলে, রাতারাতি প্রভাবশালী আ. লীগের নেতা বনে যান প্রান্ত পারভেজ। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই ক্ষমতার দাপটে বিএনপি নেতাকর্মীদেরও নানা অত্যাচার করেন কথিত এই সাংবাদিক।
অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। রাজধানীর আদর্শ নগর গেট এলাকা থেকে এক নারীর ছেলেকে সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেলে, নিজেকে সেনাসদস্যদের ভালো বন্ধু পরিচয় দিয়ে, হাজির হন প্রান্ত। ছেলেকে অস্ত্র মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে ওই মায়ের কাছে দেড় লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন তিনি।
ভুক্তভোগী ওই মা জানান, চাঁদার টাকা না দিলে, তার ছেলে ও স্বামীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেয়া হয়।
নারী কেলেঙ্কারি ও ভূমি দখল
এদিকে, মিরপুরের স্থানীয়দের দাবি, ইতোপূর্বে একাধিকবার নারীঘটিত ঘটনায় হাতেনাতে ধরা পড়েছেন প্রান্ত।
এসময়, জমির কাগজ নিয়ে স্থানীয়রা কথা বলতে চাইলে, তাদের ওপর চড়াও হন পারভেজের স্ত্রী।
শুধু নারী কেলেঙ্কারিই নয়; মসজিদের জায়গা এবং পল্লবীর সবুজ বাংলায়, সরকারি জমি দখল করে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে প্রান্ত পারভেজের বিরুদ্ধে।
ভাইরাল ফোনালাপ
এই অবস্থায়, সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ফোনালাপে তার ক্ষমতার বেপরোয়া দাপট প্রকাশ্যে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া, এক অডিওতে পুলিশ ও ডিবির নাম ব্যবহার করে, আটকের ভয় দেখিয়ে, নারীকে হুমকি দিতে শোনা যায় প্রান্তকে।
জানা গেছে, মডেল হিসেবে কাজ করার সময় ওই নারী প্রান্ত পারভেজের সহকর্মী ছিলেন। আর, পারভেজের স্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, ওই নারী বিভিন্ন সময়ে তাঁর সাথে অসদাচরণ করতেন, যার জের ধরেই পরবর্তীতে তাকে ভয় দেখানো হয়, যেন আর বিরক্ত না করে।
মামলার নথি ও অস্বীকৃতি
ইতোমধ্যেই, পর্নোগ্রাফি, চাঁদাবাজি, বিস্ফোরক, ভূমি দখল ও প্রতারণাসহ প্রান্ত পারভেজের বিরুদ্ধে থাকা একাধিক মামলার কাগজ ও নথিপত্র পৌঁছেছে টিম বাংলা এডিশনের হাতে।
তবে, এসব মামলা এবং অভিযোগ নিয়ে, প্রান্ত পারভেজ জানান, সাংবাদিকতার শুরুর দিকে তার ব্যক্তিগত ক্যামেরা অন্য একজন ব্যবহার করায়, তাকে পর্নোগ্রাফি মামলায় জড়ানো হয়েছিল। ওই মামলায়, আদালত থেকে খালাস পাওয়ার দাবিও করেন প্রান্ত। এছাড়াও, অন্যান্য মামলাও বানোয়াটভাবে দেয়া হয়েছে বলে দাবি তার।
তার বিরুদ্ধে থাকা, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল ও প্রতারণাসহ সকল অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেছেন তিনি।
এদিকে প্রান্তর বিরুদ্ধে থাকা একাধিক মামলার বিষয় নিশ্চিত করেন, পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ হাসান বাসির।
সচেতন মহলের প্রশ্ন
এসব নিয়ে, সচেতন মহলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, ডিবি পুলিশের ভয় দেখানো, সারা দেশে চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক তৈরি এবং বিস্ফোরকসহ ডজনখানেক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তিনি দিনের পর দিন কীভাবে প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে বুক ফুলিয়ে চলছেন? বিশ্লেষকদের মতে, কথিত সাংবাদিকদের কারণেই আজ চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে দেশের মূলধারার সাংবাদিকতা। তাই, প্রান্ত পারভেজের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ আবারও খতিয়ে দেখে, কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার দাবি সবার।
আরও পড়ুন:







