শুক্রবার

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০ আশ্বিন, ১৪৩৩

গরীব বলে মরদেহের মূল্য মাত্র ৯ লাখ টাকা?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:০১

শেয়ার

গরীব বলে মরদেহের মূল্য মাত্র ৯ লাখ টাকা?
ছবি সংগৃহীত

বারিধারায় সড়ক দুর্ঘটনা; চালক ক্যাপ্টেনের ছেলেকে বাঁচানোর যতো ষড়যন্ত্র! সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবন্ধীর মৃত্যু। আটক হলো কিশোর; মামলায় চালক অন্যজন—এরপর বদলে গেলো দৃশ্যপট।

মেহেদী হাসান মীম। ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে পথের ধারে বসেছিলেন নির্বিকার। হঠাৎ করেই একটি প্রাইভেটকার এসে বদলে দেয় তার জীবনের গল্প। মুহূর্তেই থমকে যায় তার পথচলা।

ঘটনার বিবরণ

গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকার বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর রোডে, ফুটপাতের পাশে বসেছিলেন বাকপ্রতিবন্ধী মেহেদী হাসান মীম। এমন সময় একটি বেপরোয়া প্রাইভেটকার, দ্রুতগতিতে এসে চাপা দেয় সেই বাকপ্রতিবন্ধীকে। জানা যায়, প্রাইভেটকারের চাপায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান মেহেদী হাসান মীম।

ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। কিন্তু, সেই আলোচনার ঢেউ থামার আগেই, ঘটনার দৃশ্যমান চিত্রের আড়ালে শুরু করা হয় ভিন্ন এক গল্প সাজানোর অপচেষ্টা।

কিশোর আটক ও মামলার জটিলতা

অভিযোগ রয়েছে, দুর্ঘটনার পর গাড়ি চালানো অবস্থায় আজান আলী শরিফ নামের এক কিশোরকে হাতেনাতে আটক করার পর, পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে, পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। এমনকি এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আজানের নামও রাখা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

একইসঙ্গে, অভিযুক্ত আজানকে বাঁচাতে, তার পাশের সিটে থাকা ড্রাইভার আকাশকে বলির পাঁঠা বানানোর অভিযোগও সামনে আসে। বাংলা এডিশনের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ড্রাইভিং সিটে গাড়িটির চালক আকাশ নন, বরং গাড়ির মালিকের ছেলে আজানই ছিল।

জানা যায়, ১৭ বছর বয়সী কিশোর আজান বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের ক্যাপ্টেন আব্বাস আলী শরিফের ছেলে। এমনকি ঘাতক প্রাইভেটকারটি কিশোরের মা সিগমা আব্বাসের নামে নিবন্ধিত রয়েছে। অভিযুক্ত কিশোরের বয়স অনুযায়ী, বাংলাদেশের আইনে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশে পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার সর্বনিম্ন বয়স ২১ বছর, আর অপেশাদারের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে আবেদনকারীকে। আজানের বয়স মাত্র ১৭ হওয়ায়, তার কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিলো না। তবুও, তিনি সেদিন গাড়ি চালাচ্ছিলেন।

এদিকে, সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যখন ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক—প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণেই কি আজানকে বাঁচানোর এই অপপ্রয়াস?

তবে, তীব্র সমালোচনার মুখে ওই কিশোরকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করে পুলিশ। পরে ঢাকা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিচারক তাকে গাজীপুরের টঙ্গীর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

নয় লাখ টাকায় আপসনামা

এরকম, উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই বাংলা এডিশনের হাতে আসে, মামলা রফাদফার অপসনামার দলিল। যেখানে, অভিযুক্ত কিশোরের পরিবার নিহতের ময়নাতদন্ত ছাড়াই কাফন-দাফনসহ মামলা মিটমাটের জন্য, মোট ৯ লাখ টাকা দিয়ে, একটি আপসনামা সম্পাদন করে বলে উল্লেখ রয়েছে। আপস। আপসনামার দলিলের ছবি যাবে।

অপরদিকে, মীমের ভগ্নিপতি মুজিবুর রহমান জানান, মামলা মিটমাটের বিষয়ে গুলশান থানার অসৎ উদ্দেশ্যের কথা তারা আগে বুঝতে পারেনি।

তবে, নিহত মিমের চাচা রাকিবুল ইসলাম রকি দাবি করেন, আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে, ঢাকায় গিয়ে মামলা চালানো তাদের জন্য কঠিন হবে। তাই, পরিবারের সবার মতামতের ভিত্তিতেই, মামলা সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নাজমুন নূর বলেন, টাকা দিয়ে মামলা মিটমাটের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

পরিবারের শোক ও বিচারের দাবি

অন্যদিকে, বাক প্রতিবন্ধী মেহেদীর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা, এলাকাবাসী ও স্বজনদের মাঝে। একইসঙ্গে, এই মর্মান্তিক ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে তারা।

একটি কিশোরের খামখেয়ালিতে থেমে গেল একটি প্রাণ। না জানি, সমাজের চক্ষুর আড়ালে এভাবেই প্রতিনিয়ত নিভে যাচ্ছে আরও কত প্রাণ। প্রভাবশালীদের দাপটে মেহেদী হাসান মীমের এই মৃত্যুর বিচার না হলে, আশকারা দেয়া হবে অন্যায়কে। সেইসাথে, দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতির প্রমাণ মিলবে আরো একবার। একইভাবে, দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার ওপরও আস্থা হারাবে মানুষ। তাই, এতসব হিসেব মাথায় রেখে, মীমের মৃত্যুর জন্য প্রকৃতভাবে যে দায়ী, তাকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি সচেতন মহলের।